বাড়িরাজনীতিপ্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের নিয়ে চিন্তায় বিএনপি

প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের নিয়ে চিন্তায় বিএনপি

রাজনীতি ডেস্ক: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের এককভাবে মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত প্রভাব বা লবিংয়ের পরিবর্তে জনসম্পৃক্ততা ও যোগ্যতাই হবে প্রার্থী নির্ধারণের মূল মাপকাঠি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি গোপন জরিপ চালানো হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্যেও দলের ভেতরে নতুন করে এক ধরনের দুশ্চিন্তা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। বিশেষ করে প্রার্থী বাছাই কার্যক্রমে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, স্বচ্ছ জরিপের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করতে গেলে সংসদ সদস্যদের প্রভাবের কারণে সেটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যে সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম ভোটার ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা রয়েছে। প্রথমে প্রতিটি উপজেলা কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রস্তুত করে তা জেলা কমিটির কাছে পাঠাবে। এরপর জেলা কমিটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সেই তালিকা বিভাগীয় টিমের কাছে জমা দেবে। কোনো স্তরে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় হাইকম্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারক করতে এবং নির্বাচন পরিচালনার কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে চার সদস্যের একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন এবং একাধিক নাম সামনে আসাও স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সবার মধ্য থেকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী এক জনকেই দল সমর্থন দেবে। কোনো অবস্থাতেই যাতে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত না হন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দলের ভেতর বিভাজন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

তবে প্রার্থী বাছাইয়ের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একাধিক নেতার অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে সংসদ সদস্যরা নিজেদের অনুসারী বা পছন্দের ব্যক্তিদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে নিরপেক্ষ জরিপের ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের কর্মীরা। অনেক নেতার মতে, সংসদ সদস্যরা যদি নিজেদের পছন্দের বাইরের কাউকেই মেনে নিতে না চান, তবে সেখানে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এর ফলে ব্যক্তিগত পছন্দ দলীয় স্বার্থের ওপর স্থান পেতে পারে এবং যোগ্যরা বাদ পড়তে পারেন। তবে দলের শীর্ষস্থানীয় আরেক অংশের মতে, প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মতামতকে পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়াও ঠিক হবে না। কারণ এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ, ভোটারদের মানসিকতা এবং স্থানীয় প্রার্থীদের সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ভালো ধারণাই থাকে। তাই তাঁদের মতামতকে একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে, প্রার্থীর অতীতের কার্যক্রম, জনকল্যাণে ভূমিকা এবং জয়ের সম্ভাব্যতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তাঁরা।

এই বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা যাচাই করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত যোগ্যতম ব্যক্তির পক্ষেই দল অবস্থান নেবে। অন্যদিকে, সংসদ সদস্যরা দলীয় নির্দেশনা মেনেই কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন। সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সবাই সেটি বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছেন এবং মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকে থাকলেও দল একজনকে চূড়ান্ত করবে। বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন মনে করেন, প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি জটিল হলেও দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাই সচেষ্ট থাকবেন এবং নেতাকর্মীরা দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য থাকবেন। একইভাবে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানও আশাবাদী যে, সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী তালিকা উপহার দিতে সক্ষম হবে দল।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments