বাড়িবাণিজ্যজলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বছরে ক্ষতি ২ হাজার ৭০ কোটি ডলার

জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বছরে ক্ষতি ২ হাজার ৭০ কোটি ডলার

অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে প্রতিবছর বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে এই alarming তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যখাতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় দুই হাজার ৭০ কোটি ডলার বা দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির চার দশমিক ছয় শতাংশের সমান। মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যু এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করেই মূলত এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। তবে জলবায়ুজনিত এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য দেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ সংশ্লিষ্ট গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মূলত বিগত দশকের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে অসহনীয় তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হৃদ্রোগ, কিডনি জটিলতা এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার লাভের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

গবেষণার হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে দেশে প্রায় দুই হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। কেবল এই নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার অর্থনৈতিক মূল্যই প্রায় এক হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের সমান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের কৃষি খাত, যেখানে মোট হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় চৌষট্টি শতাংশ ব্যয় হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে কেবল কৃষিশ্রমিকরাই নন, বরং নির্মাণশ্রমিক এবং খোলা আকাশের নিচে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করা পেশাজীবীরাও প্রতিনিয়ত নিজেদের কর্মক্ষমতা ও আয় হারাচ্ছেন। তবে এই হিসাবের মধ্যে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রাণঘাতী নয় এমন অন্যান্য অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয় যুক্ত করা হয়নি। ফলে বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থনীতির ওপর সামগ্রিক ক্ষতির বোঝা আরও অনেক বেশি ভারী হবে বলে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। মডেলভিত্তিক বিভিন্ন হিসাবের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কেবল উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা জটিলতার কারণে এক বছরে দেশে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বন্যায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট তৈরি হওয়া, সামগ্রিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকিগুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সাধারণ মানুষ তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিজেদের পকেট থেকেই ব্যয়ের সিংহভাগ বহন করছে, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় চাপ তৈরি করছে।

গবেষণায় ডেঙ্গু সংক্রমণের সঙ্গে তাপমাত্রার একটি স্পষ্ট যোগসূত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে পরবর্তীতে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভর্তির হার বহুগুণ বেড়ে যায়। কেবল একটি নির্দিষ্ট বছরেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যার সঙ্গে বহির্বিভাগের চিকিৎসার খরচ যুক্ত নেই। তাছাড়া গত কয়েক বছরে আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বায়ুদূষণের কারণে বহু মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁkinর শিকার হয়েছে। অথচ এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বরাদ্দকৃত বাজেট যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জলবায়ুসংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ অর্থের খুব সামান্য অংশই সঠিকভাবে ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যখাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন যে, বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক স্বাস্থ্যগত প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সুপারিশমালা পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের আগেই একটি কার্যকর জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দেশের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যখাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন গবেষকরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। মহিলা, শিশু ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments