অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নতুন এক কৌশলগত মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবি সরকারের সম্পদের শতভাগ মালিকানা অক্ষুণ্ণ রেখে যমুনা সেতুর ভবিষ্যৎ টোল আয়কে আগাম নগদায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুঁজিবাজারে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি ইসলামিক বন্ড বা সুকুক আল-ইজারা ছাড়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিনিয়োগ সংস্থাটি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে এটি দেশের বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে একটি টেকসই ও নিজস্ব উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রস্তাবিত এই দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের বাজারমূল্য ও আর্থিক কাঠামো তৈরি করেছে আইসিবির পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগ। প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই সুকুকের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০ বছর এবং এর মুনাফার হার হবে মুদ্রাস্ফীতির হারের সঙ্গে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ যোগ করে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত বা এসএলআর পূরণের জন্য সুকুকটিকে অনুমোদিত সিকিউরিটি হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে চালুর পর থেকে এই সেতু থেকে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে, যা এই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্যের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ মনে করেন, উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও নিজেদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের পথ সুগম করতে হবে। সেতু থেকে নিয়মিত যে টোল আদায় হয়, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সরকারকে সবসময় বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এই মডেল সফল হলে পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য বড় অবকাঠামো যেমন পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলকেও এই কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিকল্প অর্থায়নের সফল নজির রয়েছে বলে আইসিবির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অব ইন্ডিয়া সড়ক প্রকল্প থেকে ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছে। মালয়েশিয়া ও তুরস্কেও সেতু ও সড়ক অবকাঠামোর পরিচালনা এবং টোল আদায়ের অধিকারভিত্তিক বিভিন্ন অর্থায়ন মডেল সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে।
তবে এই বিশাল অংকের অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু ঝুঁকিও থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন। যানবাহন চলাচল হ্রাস পাওয়া বা নীতিগত কারণে টোলহার না বাড়লে প্রত্যাশিত আয় ব্যাহত হতে পারে। এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে একটি সংরক্ষিত তহবিল বা সিংকিং ফান্ড গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি গ্যারান্টি এবং স্বাধীন নিরীক্ষার বিষয়টিও স্পষ্ট করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংগৃহীত অর্থ নতুন মহাসড়ক ও বন্দর নির্মাণসহ দেশের সার্বিক অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।



