আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের কাছে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিল শ্রমজীবী মানুষেরা। সামরিক স্থাপনা ও অভিজাত বাংলোর মাঝে গড়ে ওঠা এই বসতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করতেন বহু হিন্দু ও মুসলিম পরিবার। স্থানীয় ধনী পরিবারগুলোতে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং মালি হিসেবে কাজ করতেন তারা। সরকারি জমিতে অবৈধভাবে ঘর নির্মাণের অভিযোগ এনে এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কথা বলে গত বছরের অক্টোবর মাসে এসব বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। এর ফলে কয়েকশ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের অনেকেই দিল্লি থেকে বহু দূরে সাভদা ঘেভরা কলোনিতে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হন।
উচ্ছেদের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকেরই এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর আবেগ ও স্মৃতির সুতো। মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তার বাবার বিয়ে হয়েছিল এই অঞ্চলেই এবং পরবর্তীতে তার মেয়ের বিয়েও হয় একই স্থানে। অথচ আজ সেখানে তাদের পুরোনো বাড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই। উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাসিন্দারা দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করলেও আদালত পুনর্বাসনের পক্ষে রায় দেয়। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন একটি পুরোনো মসজিদ ও একটি হিন্দু মন্দির অক্ষত রাখা হলেও সেগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ফলে ঐতিহাসিক এই মসজিদ চত্বরে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং মুসল্লিদের প্রায়শই ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মসজিদটির মালিকানা নিয়ে সরকার ও ওয়াক্ফ বোর্ডের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। সরকারের দাবি জমিটি তাদের, অন্যদিকে ওয়াক্ফ বোর্ডের মতে ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং এর বয়স প্রায় ৩০০ বছর। মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবিতে এবং এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ওয়াক্ফ বোর্ড ও স্থানীয় মুসল্লিরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করার আগে ওয়াক্ফ বোর্ডের আপত্তি বিবেচনা করে সাময়িকভাবে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে এত আইনি লড়াইয়ের মাঝেও ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা কাটছে না।
শহরের দূরবর্তী প্রান্তে পুনর্বাসিত হওয়ার পর এই শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। সাভদা ঘেভরা কলোনিতে স্থানান্তরের ফলে তাদের কর্মসংস্থান ও সন্তানদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাবলু নামের এক বাসিন্দা জানান, সন্তানদের পুরোনো স্কুলে পৌঁছে দিতে প্রতিদিন তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। বয়স্ক বিধবা আখতারি বা গৃহকর্মী রেখার মতো মানুষেরা আগে ছোটোখাটো কাজ করে বা জিনিসপত্র কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও নতুন এলাকায় গিয়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। নগর গবেষকদের মতে, এ ধরনের উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতি শ্রমজীবী মানুষকে তাদের সামাজিক নেটওয়ার্ক ও জীবিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা তাদের জীবনকে আরও বেশি সংকটাপন্ন করে তোলে।



