বাড়িজীবনযাপনপ্রয়োজনের অর্ধেক শিক্ষক সরকারি মেডিকেলে

প্রয়োজনের অর্ধেক শিক্ষক সরকারি মেডিকেলে

স্বাস্থ্য ডেস্ক: দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে তীব্র শিক্ষকসংকট বিরাজ করছে যা চিকিৎসাবিদ্যার মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ের পাঠদান ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে মোট অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেক জুড়েই কোনো শিক্ষক নেই। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, কিউরেটর ও প্রভাষক—এই পাঁচ শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ পদে হাজার হাজার পদ খালি পড়ে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম। পুরোনো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলো পর্যন্ত সবখানেই এই জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অথচ প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাবিদ্যা অর্জনের জন্য ভর্তি হন, যাদের ভবিষ্যৎ পেশাগত দক্ষতা নিয়ে এখন বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে শিক্ষকসংকটের চিত্র সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর অর্ধেকের বেশি অংশই শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক এবং প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত ১ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার সিকিভাগও বজায় রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও ফার্মাকোলজির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না পাওয়ায় অন্য বিভাগ থেকে প্রেষণে চিকিৎসক এনে বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোনোমতে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এর ফলে নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

নতুন প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজগুলোর ক্ষেত্রে এই সংকট আরও গভীর রূপ নিয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা কলেজগুলোতে নিজস্ব ক্যাম্পাস, হাসপাতাল এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষকসংকট অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কলেজে অর্ধেকের বেশি পদ খালি রয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো অধ্যাপকই কর্মরত নেই। ফলে সেখানকার অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। এমনকি বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা ও রাজশাহীর মতো পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বড় মেডিকেল কলেজগুলোতেও শত শত পদ শূন্য পড়ে রয়েছে, যা সামগ্রিক চিকিৎসাশিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ প্রস্তুতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই না করে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্বিচারে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কারণেই এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ পর্যাপ্ত শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই নতুন কলেজ চালুর প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, নিয়মিত শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি না দিয়ে অতিরিক্ত বা সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করায় মেডিকেল কলেজগুলোর প্রকৃত শূন্যতা দূর হচ্ছে না। এই সংকট নিরসনে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, অন্যথায় মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব হবে না।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments