বাড়িবাংলাদেশইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫

ইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫

শিক্ষা ডেস্ক: দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কৃতি মেয়েসন্তানদের জন্য আইডিএলসি ও প্রথম আলো ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে প্রদান করা হচ্ছে বিশেষ অদ্বিতীয়া বৃত্তি। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের এই ছাত্রীদের আবাসন ও টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তির সুবিধা পেয়েছেন। এর মধ্যে স্নাতক সম্পন্ন করা ৮৬ জন শিক্ষার্থীর অনেকেই দেশ ও বিদেশে সফলতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। সম্প্রতি এই বৃত্তির জন্য নতুন করে আরও ১৫ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছে।

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের এক দরিদ্র চা-শ্রমিকের সন্তান অন্তরা তাঁতী অভাবের কারণে ছোটবেলায় গাইড বই কিনতে না পারলেও বন্ধুদের বই ধার করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বাসায় স্মার্টফোন না থাকায় আত্মীয়ের মুঠোফোনে ইউটিউব দেখে ক্লাস করে তিনি ২০২২ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও যাতায়াতের খরচ বহন করা তাঁর পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই অদ্বিতীয়া বৃত্তি তাঁর উচ্চশিক্ষার পথকে সুগম করার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের চা-শ্রমিক মা ও কৃষিজীবী বাবার কন্যা অনিমা রানী পাল চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করেননি। চার বোনের এই সংসারে বাবা-মার সীমিত আয়ে সাত সদস্যের পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কষ্টসাধ্য, এর ওপর পড়াশোনার বাড়তি ব্যয় বহন করা তাঁদের জন্য ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বান্দরবানের জুমচাষি পরিবারের সন্তান লিডিয়া বম স্কুলের পোশাক কেনার টাকা জোগাড় করতে অন্যের জুমে কাজ করেছেন। উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার খরচ চালাতে পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে ঢাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এই বৃত্তির সন্ধান পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান।

খাগড়াছড়ির মেহেরুন নেছার পরিবারে নেমে আসে বড় ধরনের বিপর্যয়, যখন ২০২৩ সালে কিডনি জটিলতায় তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে, কারণ তাঁর মা গৃহিণী এবং ছোট ভাই নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। এই পরিস্থিতিতে নিজের খরচ নিজে চালিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মায়ের ওপর চাপ কমানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। একইভাবে বান্দরবানের মিকল ময় ম্রো শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মায়ের একাকী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। নানাবাড়িতে থেকে মা ও ভাইয়ের সহযোগিতায় জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এই শিক্ষার্থী দ্বিতীয়বার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তিসহ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এই অদ্বিতীয়া বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ জীবনের দুরূহ সংগ্রামের গল্প পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মা-বাবা ও পরিবারের ত্যাগ এবং সংগ্রামের কথা স্মরণ করে তারা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেদের মতো করে সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় স্বপ্ন রয়েছে তাদের। এই ধরনের বৃত্তিমূলক সহায়তা কেবল শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাই সচল রাখছে না, বরং তাদের সুদূরপ্রসারী ক্যারিয়ার গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments