বাড়িবাংলাদেশযে লাউ সেই কদু

যে লাউ সেই কদু

ফিচার ডেস্ক: প্রবাস জীবনে থেকেও নিজের শিকড় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন এক প্রবাসী বাঙালি। জন্মসূত্রে গ্রামের সন্তান হওয়ায় তাঁর রক্তে মিশে আছে কৃষিকাজ, যা তাঁর পূর্বপুরুষদের হাত ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর দাদা জীবন বাঁচাতে পুলিশ বাহিনীকে বেছে নিলেও কৃষিকে কখনো দূরে সরিয়ে রাখেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর বাবাও সরকারি চাকরি করেও দীর্ঘ ৩০ বছর নিয়মিত কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমান প্রজন্মে এসে তিনিও ভিনদেশি মাটিতে একইভাবে কৃষির প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন।

কর্মসূত্রে বর্তমানে সুইডেনে বসবাস করলেও সেখানকার অবসর সময়ে নিয়মিত বাংলাদেশের দেশীয় শাকসবজি চাষ করে আসছেন এই প্রবাসী। শীতপ্রধান দেশের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় লাউসহ নানা ধরনের সবজি চাষ করে তিনি এক দারুণ সাফল্যের দেখা পেয়েছেন। তাঁর বাগানের এই ফলন কেবল স্থানীয়দেরই চমকে দেয়নি, বরং অনেক সুইডিশ নাগরিককেও বাড়ির আঙিনায় লাউ চাষে উৎসাহিত করেছে। বাগানের পাশেই রান্নার ব্যবস্থা থাকায় তাজা সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার তৈরি করা হয়, যা দূর প্রবাসে বসেও শৈশবের গ্রামীণ জীবনকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে।

সম্প্রতি এই লাউ দিয়েই তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশেষ ও সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী পদ, যার নাম দুধকদু। লাউ কুচি করে কেটে তার সঙ্গে গরুর ও নারিকেলের দুধ, গুড় বা চিনি এবং চালের সুজি মিশিয়ে এই মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা হয়। খাবারটি পরিবেশনের পর ভিনদেশি অতিথিদের কাছে এটি দারুণ প্রশংসা অর্জন করে এবং সবাই এর অসাধারণ স্বাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে রান্নার আগে যাকে লাউ বলা হচ্ছিল, রান্নার পর তা কদুতে রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সেখানে বেশ হাস্যরস ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।

এই পুরো ঘটনার একপর্যায়ে প্রবাসীর বিদেশি স্ত্রী মারিয়া অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি বাংলা প্রবাদ উচ্চারণ করে বসেন, যা সবাইকে অবাক করে দেয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসে তাঁর শাশুড়ির হাতের তৈরি দুধকদু খেয়েছিলেন মারিয়া, যার সুস্বাদু স্মৃতি তাঁর মনে আজও অমলিন রয়েছে। বহু বছর পর সুইডেনের মাটিতে একই খাবার খেয়ে তাঁর সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই ছোট্ট ঘটনাটি প্রমাণ করে যে খাবার কেবল পেট ভরায় না, বরং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে গভীর ভালোবাসার সেতুবন্ধ তৈরি করে।

ব্যক্তিগত এই স্মৃতিকথার বাইরেও পুরো বিষয়টি প্রবাসীকে সমাজের বৃহত্তর পরিসর নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। ভাষার ভিন্নতা বা নামের অমিল থাকলেও মূল সত্য যে অনেক সময় একই থাকে, তা এই লাউ ও কদুর গল্পে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশাপাশি কৃষির প্রতি অবহেলা না করে একে টিকিয়ে রাখা, পূর্বপুরুষের সম্পত্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিশেষে, শিকড়ের টান আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন ধরে রাখতে পারলে জীবনযাত্রার ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচে গিয়ে পৃথিবী আরও সুন্দর ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments