বাড়িবাংলাদেশটেসলার রোডস্টারের আন্ডারবডি প্রকল্পে কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক

টেসলার রোডস্টারের আন্ডারবডি প্রকল্পে কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক

প্রযুক্তি ডেস্ক: একটি আধুনিক গাড়ির আকর্ষণীয় বাহ্যিক নকশার পেছনে লুকিয়ে থাকে জটিল প্রকৌশলগত উদ্ভাবন এবং দীর্ঘ গবেষণার নানান অজানা গল্প। বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার বহুল আলোচিত রোডস্টার মডেলের আন্ডারবডি বা নিচের কাঠামো তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলগত কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এক বাংলাদেশি তরুণ। বুয়েটের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তারেক সরোয়ার কয়েকমাস টেসলায় ইন্টার্ন থাকাকালীন এই গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেন। পরবর্তীতে গাড়িটির চূড়ান্ত রূপ বাজারে আসার পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই কাজের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন তিনি। তার এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের মেধার জোরালো স্বাক্ষরও বটে।

গাড়ি নির্মাণশিল্পে প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত একাধিক ধাতব পাত ও ছোট ছোট যন্ত্রাংশ জোড়া লাগিয়ে আন্ডারবডি তৈরি করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় বহু ধাপের আলাদা কাজ। তবে টেসলা এই প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে আন্ডারবডির পুরো কাঠামোটি একসঙ্গে একটিমাত্র যন্ত্রাংশ হিসেবে তৈরির যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। উৎপাদনপ্রক্রিয়া সহজ ও সাশ্রয়ী করার এই বিশাল লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটিকে বেশ বড় ধরনের প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ এত বড় আকৃতির কাঠামো একবারেই ঢালাই করে তৈরি করতে হলে ব্যবহৃত উপাদানের সঠিক বৈশিষ্ট্য ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সামান্য কোনো ত্রুটি পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, যা এ ধরনের প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

এই প্রযুক্তিগত জটিলতা সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে টেসলার প্রকৌশলীরা একটি বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় উদ্ভাবন করেন এবং বিশাল আকারের আন্ডারবডি একবারে ঢালাই করার প্রক্রিয়া সফলভাবে আয়ত্ত করেন। প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে তারেক জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে মাত্র প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একটি করে এমন জটিল যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব। উত্তর আমেরিকার গাড়ি নির্মাণশিল্পে একসঙ্গে এত বড় যন্ত্রাংশ ঢালাই করার এমন অনন্য উদাহরণ আর নেই বললেই চলে। তবে শুধুমাত্র বড় আকারের যন্ত্র তৈরি করাই শেষ কথা নয়, বরং নির্ধারিত মান বজায় রেখে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তা ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করাও ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

এই পুরো প্রকল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল বিভিন্ন তীব্র আবহাওয়ায় আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করা। তারেক সরোয়ার তার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও মেধা কাজে লাগিয়ে চরম তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত নানা প্রভাবের মুখে ধাতব যন্ত্রাংশটির আচরণ কেমন হবে তা গভীর মনোযোগের সঙ্গে বিশ্লেষণ করেন। নকশা চূড়ান্ত করার পূর্বেই এই ধরনের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ সম্ভাব্য দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে এবং প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। তার এই গবেষণালব্ধ ফলাফল পরবর্তী সময়ে গাড়িটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে সরাসরি ব্যবহার করা হয়, যা এই জটিল প্রকল্পে তার সুনির্দিষ্ট অবদানের স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

প্রকল্পে কাজের তিন বছর পর টেসলার সেই রোডস্টার গাড়িটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল তারেক সরোয়ারের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও গর্বের। একটি বিশাল প্রকৌশল প্রকল্পের শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু অংশ নিয়ে কাজ করার সময় চূড়ান্ত পণ্যটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। পরবর্তীতে যখন সেই পরিশ্রমের বাস্তব রূপ চোখের সামনে ধরা দেয়, তখন নিজের অবদানের সঙ্গে চূড়ান্ত পণ্যের নিখুঁত যোগসূত্র নতুনভাবে অনুভূত হয়। বুয়েটে অর্জিত সুদৃঢ় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের যুগান্তকারী উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই অভিজ্ঞতা আধুনিক গাড়ি নির্মাণে উপাদানবিজ্ঞানের অপার সম্ভাবনার কথাই আবার নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments