ভয়ঙ্কর ঘূণিঝড় ” বুলবুল”

0
13

সময়ের কলম অনলাইনঃ
ভয়ঙ্কর বুলবুল ধেয়ে আসছে
উত্তাল সাগর। সতর্ক করে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাইকিং। বুলবুলের গতিপথ -বাংলাদেশ প্রতিদিন
ঘণ্টায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। বার বার দিক পাল্টাচ্ছে বুলবুল। আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে।

গতি আরও বাড়ার আশঙ্কাও আছে। প্রতি ৬ ঘণ্টা পর ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সাত উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলায় নেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ সতর্কতা।
ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে বিভিন্ন মাত্রার বিপদসংকেত ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ উপকূলের ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌছে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে এলে এ সংকেত আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। অবশ্য ইতিমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে।
আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

ওই সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি জানান, গতিবেগ আগের চেয়ে বেশি। ঝড়টি এখন যে গতিতে আসছে, তাতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। খুলনা অঞ্চল দিয়ে ঝড় প্রবেশের আশঙ্কা করেন তিনি। এ ছাড়া ঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল, নড়াইল ঝিনাইদহ, মাগুরা, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে ভারি থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক। বৈঠকে উপকূলবর্তী সব জেলা ও উপজেলায় প্রায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপকূলের ১৩ জেলার মধ্যে ৫টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝড়ের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। উপকূলবর্তী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুরসহ ১৩টি জেলায় ২ হাজার করে মোট ২৬ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি জেলায় নগদ ৫ লাখ টাকা করে আগাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৭ জেলার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় লোক সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় ২ হাজার প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌছে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটার যে গতি ও যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে তাতে আঘাত হানবে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে। গতি আরও বাড়লেও যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে ফসল ছাড়া বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা নেই। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীকাল (শনিবার) বেলা ১১টায় সচিবালয়ে প্রস্তুতি সভায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা-উপজেলার সংশ্লিষ্টদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন সব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফকর উদ্দিন জানান, মোংলা বন্দরে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেওয়ার পর বন্দরে অ্যালার্ট- ৩ ঘোষণা করে পণ্য বোঝাই ও খালাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এইসঙ্গে বন্দরে থাকা ১২টি জাহাজকে জেটি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের পশুর চ্যানেল থেকে সব ধরনের লাইটার জাহাজও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দরে খোলা হয়েছে ২টি কন্ট্রোল রুম।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সুন্দরবনের দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি বনে ভ্রমণে থাকা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন বিভাগের ৮৩ বন অফিসের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা ও বনরক্ষীকে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলে প্রথমে নিজেদের জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পায়রা বন্দরের পরিচালক প্রশাসন যুগ্মসচিব মো. মহিউদ্দিন খান জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকেই আমরা সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টির খোঁজখবর রাখছি। সে অনুযায়ী শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে বন্দরের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো জাহাজগুলো নিরাপদে রাখা হয়েছে। বন্দরে নিয়োজিত ১৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে সবাইকে সর্তক থাকার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আগামীকাল (শনিবার) কয়লাবাহী একটি জাহাজ নোঙর করার কথা থাকলেও মেসেজ দিয়ে ওই জাহাজকে না আসার জন্য বলা হয়েছে। বুলবুলের আঘাত হানার বিষয়টি আমরা সর্বক্ষণ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছি। ’

কুয়াকাটাসংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ জেলার সব উন্নয়ন কর্মকা স্থগিত রেখে শ্রমিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টানা তিন দিনের ছুটি থাকায় কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গতকাল দুপুর ১২টায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে সিবিচসহ পুরো কুয়াকাটায় সতর্কতার মাইকিং করার পর পর্যটকরা তড়িঘড়ি যে যার গন্তব্যের জন্য স্থান ত্যাগ করেন।

জেএসসি-জেডিসির শনিবারের পরীক্ষা স্থগিত : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর কারণে সারা দেশে আজ শনিবার অনুষ্ঠেয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক গতকাল রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন। মু. জিয়াউল হক জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর কারণে শনিবারের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থগিত হওয়া জেএসসি পরীক্ষাটি আগামী ১২ নভেম্বর ও জেডিসি পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শনিবারের পরীক্ষা স্থগিত : এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শনিবার (৯ নভেম্বর) অনুষ্ঠেয় সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আজ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ এবং এলএলবির পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়জুল করিম শুক্রবার বলেন, স্থগিত পরীক্ষার তারিখ পরে জানানো হবে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলে ধেয়ে আসার খবরে রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে সুন্দরবনের আলোর কোলে শত বছরের ঐতিহ্য রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

০৯ নভেম্বর ২০১৯/ সময়ের কলম/ হালিমা খাতুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here