হাসনাহেনা রানুর গল্পকথায় ‘শেষ শরতের কাশকন্যা’

0
56

শরৎ প্রায় যায় যায় করছে। আর মাত্র একদিন আছে।এই শরতের দ্বিতীয় বসন্তে নীড়ের মনে অদ্ভুত একটা ইচ্ছে জাগে —- দূরের কোন এক কাশবনে ঘুরতে যাবে।ও ঠিক করল, ওর খুব কাছের বন্ধু বিপ্লবকে সঙ্গে নেবে।এত বন্ধুর ভীড়ে এক বিপ্লব ওর খুব কাছের বন্ধু।ও হঠাৎ বিপ্লবকে ফোন করল,হ্যালো.. হ্যালো… বিপ্লবের সেল ফোনে নীড়ের নম্বরটা ভাসছে। ফোন রিসিভ করল বিপ্লব —- হ্যালো.. হ্যালো… নীড়! ক্যামন আছিস? হঠাৎ কি মনে করে স্মরণ করলি বল…। নীড় ছোট্ট করে বলল, ভাল আছি। হেয়ালি রাখতো…।আমার একটা কথা রাখবি? বিপ্লব একটু চমকে যায়। বলে,কি কথারে বল? এভাবে বলছিস কেন? আজ পর্যন্ত আমি তোর কোন কথাটা রাখিনি বল?
নীড় বলল,হুম শোন না —– শরৎ প্রায় যায় যায় করছে। তুই আমাকে একটা বিকেল দিবি? আমরা সে বিকেলের হাত ধরে দূরের কোন কাশবনে হাঁটতে যাব।
———-
হেসে ওঠে বিপ্লব, ওহ এই কথা।কেন দেব না? চল না — –কবে যাবি? নীড় বলল,তবে আর দেরী কেন? আজই চল না বিকেলেই বেরিয়ে পড়ি..। আজ? বিপ্লব বলল,ওকে ম্যাডাম বিকেল চারটায় আমরা যাচ্ছি তাহলে…।
ওকে, গুড বাই বলে নীড় লাইনটা কেটে দিল।
ওরা বিকেল চারটায় স্বপ্নপুরী যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করল। শহর ছেড়ে অনেক দূরের পথ। বিপ্লব বাইক নিয়ে এসেছে। যেতে যেতে পথে বৃষ্টি হল। ওরা দু’ জনেই বৃষ্টিতে ভিজেছে।বিপ্লব বলল, অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি। আজ তোর সঙ্গে বৃষ্টি বিলাস করলাম। কি যে ভাল লাগছে নীড়… এ অনুভূতি তোকে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। এই নীড় তোর হঠাৎ কাশবনে ঘোরার শখ হল কেনরে? আমাকে বলবি? ঘুরতে যাওয়ার আরও অনেক জায়গা ছিল। নীড় বলল,হুম তা হয়ত ছিল।কিন্ত তুই কি জানিস, শরৎ হল দ্বিতীয় বসন্ত। কাশফুল শুভ্রতার ডানায় থোকা থোকা সাদা মেঘের আঁচল ছড়িয়ে শরতের আর্বিভাব ঘটে। আর তখন আমার মনটাও উচ্ছ্বাসিত কাশফুলের মত নরম হয়ে যায়। ও তুই বুঝবি না বিপ্লব।আগে চল কাশবনে ——— তারপর দেখ কি উচ্ছ্বাস লেগে আছে প্রতিটি কাশফুলের ছড়ায় ছড়ায়। যেন আকাশ বুকে ভেসে যাওয়া বড় বড় মেঘ পাহাড়ে কবিতার গল্পর কথা বলছে।আরে আমি তো রীতিমতো কাশ রাজ্যে স্বপ্ন বিলাসী কাশ মহল বানানোর কথা ভাবছি।কিন্ত কি জানিস,আমার সে স্বপ্ন মহলে আমার পাশে থাকার মতো কোন সঙ্গি নেই।আমি বড় একারে..!
——- বিপ্লব হেসে ওঠে, আরে তুই তো আস্ত একটা” কাশকন্যা। ” নরম কাশফুলের মতোই সাদা তোর মন।ওরা এক ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেল স্বপ্নপুরীর কাশ অরণ্যে। রোদ,বৃষ্টি আর ঝিরঝিরে হাওয়ায় দুলছে কাশবন।বিপ্লব কাশবন আর নীড়কে আলাদা করতে পারে না। নীড় আজ পরেছে সাদা কাশফুলের মতোই শুভ্র পোশাক।স্বপ্নপুরীর দিগন্ত ছুঁয়ে বেড়ে ওঠেছে মাঠের পর মাঠ কাশবন। বিস্ময়ে অভিভূত হয়েই সেদিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিপ্লব। নীড় কাশবনে পা রেখেই ভীষণ উচ্ছ্বাসিত হয়ে ওঠে। বলে,ওয়াও বিপ্লব ! স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তো এখানেই আছে আমার বিশ্বাস…। নীড় কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়ায় কাশবনে।
বিপ্লব বলল, সত্যিই নীড় আজ যদি আমি না আসতাম, তো সত্যি খুব খু- উ- ব মিস করতাম এমন হৃদয় কাড়া অপূর্ব দৃশ্যাবলী। নীড় বলল, তুই আসবি না মানে? তোকে হাজার বার আসতে হতো। তুই ছাড়া আমি অচল তুই জানিস না? আরে তুই ছাড়া এমন দৃশ্য আমি একা চোখে দেখব নাকি? জানিস তো, একটা বোরিং লাইফ পার করছি। মাঝে মধ্যে তোর সঙ্গ ভীষণ ভাললাগেরে। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল তো?
বিপ্লব বলল, কেনরে তুই না ওই কাইফিকে ভালবাসিস? উত্তরে নীড় বলল, নারে তোর জানায় ভুল আছে। আমি তোকে বানিয়ে বলেছি। আর তুই তো ক্যাইসাকেই ভালবাসিস বিপ্লব। বিপ্লব বলল, নারে তোর জানাতেও ভুল আছে। আমি তোকে বাড়িয়ে বলেছি। তবে ঠিক কোনটা বিপ্লব —।
আমি তোকে ভাল ———– কথা শেষ করতে পারে না বিপ্লব।ওর গলাটা কেঁপে কেঁপে ওঠে থেমে গেল। হাতটা বাড়িয়ে দে নীড় —।মুহূর্তে নীড়কে কাছে টেনে দু’ হাতে ওর চিবুক উন্মোচন করে বলল,তুই কি আজও আমায় বন্ধু ভাবিস —। নাকি বন্ধুর চেয়ে একটু খানি বেশি….।এক ঝটকায় নীড়কে বুকে টেনে নিল বিপ্লব।ও বুকে পড়ে নীড় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।এই একটা সত্য কথা বলতে তুই এতটা সময় নিলি…। বিপ্লব বলল,বাহরে!
দেরী হলেও আমি তবু তো বলেছি। তুই তো সেটুকুও পারলি না। বোকা মেয়ে…। বিপ্লব ফিসফিস করে বলল, ———-
— ডেকেছিস কেন, এই নিরালায়
কিছু কি বলবি? বল না —
কি বলবি,
বল..
আমি শুনবো —
তোর সব কথা —
কেন এতো লুকোচুরি খেলা…
আর নয় কোন লুকোচুরি ধাঁধাঁ
বরং খোলামেলায় বল —
দৃঢ় উচ্চারণে…
আমার প্রেমে অঙ্কুরিত
কাশকন্যা তুই —
ভালবাসার ফ্রেমে বাঁধা
তোকেই শুধু চাই–
বলনা পাখি —–
শেষ শরতের কাশকন্যা
আমি শুধুই তোর
তোকেই ভালবাসি — কি যে ভীষণ
মিষ্টি কাশফুল ঘ্রাণের মতোই
ভালবাসি —- —- !
নিজের বিস্ময় আড়াল করে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল নীড়।পর মুহূর্তে বলল,উফ্ আমার কথা ছাড়। এতক্ষণ তুই আমার কথায় বললি। তুই তখন কি যেন বলতে যেয়ে থেমে গেলি। বল না সোনা —। যে কথা আজও আমার শোনা হয়নি। হ্যাঁ, বলব বলেই তো হাজার বিকেল থেকে এই একটি বিকেল তুলে রেখেছি তোর জন্য নীড়।কাছে আয় না সোনা — আরও কাছে …।বিপ্লব নীড়ের কানে ফিসফিস করে বলল,আমি তোকে ভালবাসি নীড় –।নীড়,নীড় তুই শুধুই আমার কাশকন্যা—। নীড় স্থির চোখে বিপ্লবের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল ——
অনেক পথ খুঁজেছি তোকে
কোথাও পাইনি —
তুই ছিলি কোন সে অতল
কাশফুলের আদরে
শুভ্রতার আঁচলে
জনম জনম বাঁধা ছিলি কি তুই?
তিন সত্যিই বলছি
আমি তোকেই ভালবাসি…!
শরৎ ও একদিন ফিরে আসে নীড়ে
তুই চিরদিন পাশে থাক
আমায় গহীন অরণ্যে কাশকন্যা করে রাখ
দিক্ – দিগন্তে ইথারে ভেসে ভেসে
মিষ্টি মধুর কাশ ঘ্রাণ
ছড়াব তোর হৃদয়ে বারমাস ;
তোর সংস্পর্শে ভিজে যাক এ গহন বুক,
তুই আমার শরৎ প্রকৃতির সবটুকু সুখ
এ অন্দরে বহু আগেই তোর অনুপ্রবেশ,
তোর মতো আমিও আছি তোর—
স্বপ্নের ভেতর….।
নীড়ের চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। বিপ্লব নীড়ের কপালে কয়েকটা চুমুর স্পর্শ দিল।ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলে, তবে আর কাঁদছিস কেন? আমি তোর। শুধু তোর।
— নীড় ছলছল চোখে বলে, জানি।— এ জল মুছিস না।এ আমার আনন্দ অশ্রু!

তোকে আমার করে পাবার।দেখ- সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চল আজ আর হাতে সময়- নেই।ফেরা যাক…. নতুন গন্তব্যে ফেরার জন্য…….

ওরা তখন হৃদয়ের গহীনে পা বাড়ায়—–!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here