নানাবিধ সমস্যায় রেমিটেন্স যোদ্ধারা

0
173

মোঃওসমান গনি :: বিশ্বের যেকোন দেশ কে অর্থনৈতিক ভাবে চাঙ্গা হতে হলে সে দেশের মোট জনগোষ্ঠী কে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশই স্বনির্ভরশীল দেশ নয়।এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশ একটি। আমাদের বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখালেও এর জন্য সবার আগে ধন্যবাদ পাওয়ার অধিকারী গোষ্ঠী হলো আমাদের দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধারা। যাদের অগাধ পরিশ্রম আর তাদের শরীরের ঘাম ও রক্ত জড়ানো পয়সায় আজ বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাদের অবস্থান কি সেটা কি কেউ একবার চিন্তা করে দেখছে? আমাদের দেশের রেমিটেন্স প্রবাহের বেশিরভাগ আসে বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে। এটি আমাদের দেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের যে কোনো সংকট স্বাভাবিকভাবেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সেই আশঙ্কা ক্রমে মূর্ত হয়ে উঠছে। এমনিতেই একদিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের আভ্যন্তরীণ বেসরকারী বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মন্দাভাব অব্যাহত আছে, তার উপর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান বাজারগুলোতে অচলাবস্থা কাটছে না। বিশেষত: সউদি আরব ও মালয়েশিয়ার মত বন্ধুপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমিকের অব্যাহত চাহিদা সত্তেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নানাবিধ আইনগত সংকটসহ ভিসা ও কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। প্রতিদিনই বিদেশ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের লাশ আসছে। নানামুখী চাপে কর্মস্থলেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে বাংলাদেশি যুবকরা। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসি শ্রমিকদের কষ্ট বঞ্চনা ও সংকটের কথা উঠে আসছে। সমস্যার প্রতিকার বা পরামর্শের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়েও এক শ্রেনীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রবাসি শ্রমিকরা। বিদেশে যাওয়ার সময় এবং দেশে ফেরার পথে দেশের বিমান বন্দরেও নানাভাবে হেনস্তা, হয়রানির শিকার হচ্ছেন রেমিটেন্স যোদ্ধারা।

শুধু বৈদেশিক কর্মসংস্থানই নয়, দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্পেও ঘোর অমানিশার অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত ৬ মাসে প্রায় অর্ধশত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চাকুরী হারিয়েছেন ২৫ হাজারের বেশি শ্রমিক। আরও চার শতাধিক কারখানা বড় ধরনের সংকট ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানা যায়। এতদিন এসব সংকটের কথা চেপে রাখার চেষ্টা করা হলেও এখন খোদ বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকেই এমন সংকটের কথা স্বীকার করা হচ্ছে। ক্রেতা ও সমালোচকদের উত্থাপিত অভিযোগ ও শর্তের বেড়াজাল ডিঙ্গাতে দেশের বিনিয়োগ ও রফতানিকারকদের ব্যর্থতা ও সরকারি-বেসরকারী সমন্বিত উদ্যোগের অপ্রতুলতাই মূলত এর জন্য দায়ী। ইউরোপীয় অ্যাকর্ড এবং মার্কিন অ্যালায়েন্স নতুন নতুন শর্ত চাপিয়ে দিলেও পণ্যের দাম বাড়াতে না পারায় লোকসানের ঝুঁকিতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা। একইভাবে দেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার সউদি আরব, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রতিদিনই শূন্য হাতে ফিরে আসছে শ্রমিকরা। গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নারী শ্রমিকদের নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরার অনেক কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। তাদের এসব সমস্যা হঠাৎ করেই দেখা দেয়নি । এসব অভিযোগ ও সমস্যা দূর করার কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অবৈধ অভিবাসিদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত যে কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক যারা বছরের পর বছর ধরে সউদি আরব ও মালয়েশিয়ায় কাজ করে সে সব দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে আসছে, ভিসা জটিলতা ও আইনগত পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের গ্রেফতার বা শূন্যহাতে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার চলমান তৎপরতায় সরকারের নিরব থাকার কোনো সুযোগ নেই।

সউদি আরব থেকে দেড় শতাধিক শ্রমিক এক কাপড়ে দেশে ফেরার খবর সম্পতি একটি দৈনিকে ছাপা হয়েছে। আরো এমন সহস্রাধিক শ্রমিক ডিপোর্টেশন সেন্টারে অপেক্ষমান আছে বলে জানা যায়। অবৈধ অভিবাসি ধরতে পুলিশের ধরপাকড়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ধরা পড়ছে বাংলাদেশিরা। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আমরা যাদেরকে রেমিটেন্স যোদ্ধা বলছি, একেকজনকে দেশের অ্যাম্বাসেডর বলে আখ্যা দিচ্ছি। বন্ধু প্রতিম দেশগুলোতে তারাই এমন গণহারে ধরপাকড়ের শিকার হলে আমাদের মুখ রক্ষার আর কোনো উপায় থাকে না। সউদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান বাজারগুলোতে বিদ্যমান সংকট ও অচলাবস্থা দূর করতে এক সময় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ ও ব্যক্তিগত প্রয়াস বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। জি টু জি পদ্ধতিতে স্বল্প খরচে লাখ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত হয়েছিল। তবে সে সব চুক্তি ও প্রত্যাশা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাস্তবে রূপ দিতে যে ধরনের মনিটরিং ও বিধি ব্যবস্থার প্রয়োজন কার্যত তা না থাকায় নামমাত্র খরচে লাখ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কোনো কাজে আসেনি। দেশের প্রধান ও বৃহত্তম জনশক্তি বাজার সউদি আরবের সাথেও লাখ লাখ শ্রমিকের আইনগত বৈধতার ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে অমিমাংসিত রয়েছে। এসব ইস্যু শ্রমিকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাধানের বিষয় নয়। এটা আমাদের রাষ্ট্রের বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়। যতটা গুরুত্ব কুটনৈতিক তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর কথা, তা কখনো দেখা যায়নি। অথচ এসব দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একপাক্ষিক বা গুরুত্বহীন নয়। লাখ লাখ প্রবাসি শ্রমিকের স্বার্থ এবং দেশের ভাব-মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে সউদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মত দেশগুলোর সাথে কার্যকর সংলাপ ও সমস্যা সমাধানে কুটনৈতিক উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email- ganipress@yahoo.com
মোবা-০১৮১৮-৯৩৬৯০৯
তারিখ-২৪.৯.১৯
কুমিল্লা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here