মিজানুর রহমানের কলামে ‘কুটিলতা’

0
241

কুঠিলতা
মিজানুর রহমান মিজান

পৃথিবী একটি রঙ্গ মঞ্চ। এ মঞ্চে মানুষ প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যাচেছ। অভিনয়ের ও রয়েছে বিভিন্ন প্রকার ভেদ। অভিনয়ে সফল ও সার্থকজনকে বলা হয় অভিনেতা। আর অভিনেতা ব্যতিরেকে ও যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার অভিনয় করেন তাদেরকে কিন্তু অভিনেতা বলা হয় না। আজ আমি কলম ধরেছি অদ্ভুদ আচরন সমৃদ্ধ মানুষের মধ্যে দু’একটি কথা, দু’একজনের কথা বলতে।কেননা মানুষ কখন, কি ভাবে, কোথায়, কেমন অভিনয় করে অনেক সময় তা বুঝে উঠা মুশকিল। জানি না সম্মানিত পাঠকদের মনোরঞ্জনে তৃপ্তি প্রদানে কতটুকু সফলতা বয়ে আনতে পারবো।মানুষ আশা ও স্বপ্নকে বুকে লালন করে জীবন নৌকা চালিয়ে ওপারে পৌছার একটি স্বপ্ন সৌধ দেখে। আমিও কলম চালালাম আশার আশে। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের উপর নির্ভরশীল হয়ে।
আমি সে দিন এক বন্ধুর কাহিনী শুনে কিন্তু তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচিছ। যেহেতু বন্ধুকে কথা দিয়েছি তা লেখা আকারে প্রকাশ করার।শুরু করছি – আমার সে বন্ধু একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।ব্যবসা করার প্রেক্ষিতে অনেকের সাথে লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে বিভিন্ন ভাবে আলাপ আলোচনা করার, সংস্পর্শে আসার, কথাবার্তা বলার সুযোগ রয়েছে।একব্যক্তি সফিক নামের সর্বদা বন্ধুর দোকানে লেনদেন করে থাকেন নগদ বা বাকিতে। তবে অধিকাংশ বাকীর খাতায়-ই হয়ে থাকে।একদিন সফিকের ভাগনা এসে বলল, আমার মামা সফিক বলেছেন এক হাজার টাকার মালামাল বাকিতে দিতে এবং এ দুই শত টাকা নগদ প্রদান করেছেন। বন্ধুটি সফিকের ভাগনাকে পূর্ব থেকে চিনে। তাই এক হাজার টাকার মালামাল দুই শত টাকা রেখে দিয়ে দেয়। বিকাল বেলা সফিকের সাথে বন্ধুটির সাক্ষাৎ ঘটে।ঘটে যাওয়া ঘটনাটি বলে অকপটে। সফিক রাগান্বিত হয়ে বন্ধুটিকে জবাব দেয় , যে কেউ চাইলেই সম্পূর্ণ দোকান দিয়ে দিও। আমি জানি না। যে নিয়েছে তার কাছ থেকে উদ্ধার করে নিও। বন্ধুটি হতবাক, হতভম্ব ঘটনার আকস্মিকতায়। অথচ ঐ ভাগনাই অপরাপর সময় সফিকের কথা বলে মালামাল নিয়েছে।সফিক প্রদান ও করেছে।তথাপি বন্ধুটি নিরাশ হয়নি বা পিছিয়ে না পড়ে যুক্তি উপস্থাপন করলে সঠিক উত্তর না দিতে পারলে ও নেতিবাচক ভুমিকাতেই রাখতে চায়। যাক আপাতত বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা এখানেই সমাপ্তি ঘটে।পরদিন ভোর বেলা বন্ধুটি দোকান খোলার উদ্দেশ্যে তালা খোলার প্রস্তুতি কালে দেখা যায় সফিক তার ভাগনাকে নিয়ে আসছে বন্ধুর কাছে।বন্ধুটি হকচকিয়ে যায় ব্যাপার কি? হয়ত ভাগনাটি মালামাল নেবার কথা অস্বীকার করল নাকি, করবে নাকি ? মহাচিন্তায় , ভাবনায় পতিত হয়। নিজের টাকার মালামাল প্রদান করে অস্বীকারের সংকটে ভোগবে নাকি? বন্ধুটির কাছে এসেই সফিক তার ভাগনাকে বলে, তুমি নাকি দুই শত টাকা দিয়ে এক হাজার টাকার মালমাল নিয়েছ?ভাগ্যিস ভাগনা তাৎক্ষণিক হ্যাঁবাচক জবাব দিলে মামা ভাগনা এখন কোন কথা বন্ধুটিকে না বলে চলে যেতে উদ্যত।এমন কি ওরা চলেই যায়। বন্ধুটি তাদের চলে যাওয়ার দৃশ্যটি অবলোকন করতেই থাকে।কিছুক্ষণ পর অপর একজনের সাথে বিষয়টি শেয়ার করে। ঐ ভদ্রলোক তাকে শান্তনা স্বরুপ বলেন ,“মানুষ আজকাল হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হয়েছে।সে তার ভাগনা সাথে নিয়ে এখানে না এসে , বাড়িতে জিজ্ঞেস করেই জেনে নিতে পারত। তা না করে নিয়ে এসেছে। এসে কি ফল পেল। আবার এখন উচিত ছিল তোমাকে শান্তনা দিয়ে যাবার।সুতরাং কোন রকমে টাকাটা উদ্ধার করেই কেটে পড়”।
এ ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর সফিকের কাছে বন্ধুটি টাকা চায়। দিচিচ, দেব বলে আরো কিছুদিন অতিবাহিতে একদিন দুই শত টাকা এনে দিয়ে বলে আর পারব না। তুমি আর আমার ভাগনা জানে। এ সময় বন্ধুটি যুক্তি উপস্থাপন করলে সদুত্তর দিতে না পারলে শক্তিমত্তার পরিচয় সুচক জবাব ওর কাছ থেকে উদ্ধার করে নিও জাতীয় জবাবে কেটে পড়ে।
“দিন যায় , কথা থাকে” প্রবাদেরই মত একদিন ঐ বাজারেই সফিকের ভাগনা অপর এক দোকানীর সাথে বাকি লেনেদেন নিয়ে ঝগড়ায় হয় লিপ্ত। ঘটে মারামারি, কুস্তি। বাজার পরিচালনা কমিটি তাৎক্ষণিক বিচারের আওতায় উভয়কে এনে বিচারের ব্যবস্তা করেন। অপর দোকানীর দাবী ছিল তিনির পকেটে রক্ষিত পাঁচ হাজার টাকা সফিকের ভাগনা নিয়ে গেছে ঝগড়ার সময়। এখন টাকা পাঁচ হাজার করে আমানত রেখে বিচার চলবে।এখন দেখা যায় সফিকের কর্মকান্ড।পাঁচ হাজার টাকা জামানত হিসাবে দিতে হলে সফিকের ভাগনার এ সামর্থ মোটেই নেই। তাই মামা সফিক পাঁচ হাজার টাকা সংগ্রহে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন। অনেক কষ্টে সফিক ভাগনার হয়ে যখন টাকা জামানত হিসাবে মুরব্বিয়ানদের হাতে দেন। তখন আমার বন্ধুটি যায় এগিয়ে। মুরব্বিয়ানদের শুধায়, তার টাকা প্রাপ্তির বিষয়টি। মুরব্বিয়ানরা বিচার কাজ স্থগিত রেখে বলেন , বন্ধুর টাকার পরিমাণ ও জামানত হিসাবে প্রদান করতে সফিককে। সফিক এখন কিন্তু বড্ড বেকায়দায়। এখন সফিক দ্বারস্থ হন আমার বন্ধুর। কথা হল তোমার টাকাটা পরে দেব , তুমি বিচারটি তুলে নিয়ে আসতে। বন্ধুটির জবাব ছিল , আগে আমার টাকা নগদ প্রদান করলে বিচার তুলে আনবো। নতুবা বিচার কাজ চলবে। নিরুপায় হয়ে বন্ধুর টাকা প্রদানে হন বাধ্য। বন্ধুটি বিচার আনেন তুলে। পরবর্তী বিচারে ও তাকে জরিমানা করা হয়। এখানে কথা হল মানুষ বিপাকে পড়লে সত্য মানতে রাজি বিনা বাক্যব্যয়ে। নতুবা শক্তি, প্রভাব প্রদর্শনে খুবই পারদর্শী।
আমি একদিন অপর এক বন্ধুর দোকানে বসে আমাদের শৈশব নিয়ে আলোচনায় মত্ত। ইত্যবসরে আসেন মধ্য বয়সী এক লোক খরিদ্দার রুপে। তিনি একটি ছাতা কেনার অভিপ্রায়ে। ভদ্রলোক ছাতা হাতে নিয়ে খোলে প্রত্যক্ষ বা পরিক্ষা চালান সবকিছু ঠিকটাক আছে কিনা? দরদাম সাব্যস্ত করে মুল্য পরিশোধান্তে ছাতা নিয়ে চলে যান। অনুমান দশ পনের মিনিটের ব্যবধানে ভদ্রলোক আসেন ফিরে দোকানে ছাতা সমেত। এসেই বলেন অনুরুপ ছাতা আর আছে কিনা?বন্ধুটি জবাব দেয় হ্যাঁসুচক। তখন ঐ ভদ্রলোক বলেন পূর্বের ছাতাটি রেখে দোকানে রক্ষিত ছাতাটি প্রদান করতে। আমি ও বন্ধুটি ভদ্রলোকের ব্যবহারে সন্দেহ আসে। তাই ছাতাটি খোলি দেখে পরখ করতে। ছাতা খোলতে ভদ্রলোক এ বলে শান্তনা প্রদানে মত্ত, যে এই মাত্র নিলাম । দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। সন্দেহ আরো হয় ঘনীভুত।তিনির কথায় আমরা বিরত হইনি। তাই ছাতা খোলে
নিলাম। দেখা যায় ছাতার একস্থানে বড় একটি নুতন ছিদ্র রয়েছে। আমরা জিজ্ঞস করি ব্যাপারকি। ছিদ্র কেন। তিনির জবাব দশ বিশ টাকা নিয়ে যাও অন্যের কাছে বিক্রি করে দিতে।আমরা যখন যুক্তি প্রদর্শন করি এবং ঘটনাটা দু’একজন লোককে জানাতে বলি । তখন কিন্তু ভদ্রলোক বলেন, লোক ডাকার দরকার নেই। ছাতা না রাখলে তিনি ঐ ছাতাই নিয়ে যাবেন। আমরা সুযোগের সদব্যবহার করে বলি দু’একজন লোক ডাকলে ভাল হবে।বিষয়টি পরিস্কার হবে কেন, কি ভাবে ছিদ্র হল।ভদ্রলোক লোক ডাকতে নারাজ এবং ঐ ছাতা নিয়ে যেতেই রাজি। আমরা তিনিকে তা দিয়ে দিলাম। যাবার বেলা বলে যান , “ আমার নাতি কি করেছে জানি না। শুধু বলেছে ছাতায় ছিদ্র”।
আরেকটি ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করেই আমি এ গল্পের ইতি টানব। আমার অপর এক বন্ধু তার প্রতিবেশী দ্বারা নিপীডিত , নিগৃহীত সর্বদা সংখ্যালঘু, নিরীহ ও অসহায় বলে। কিন্তু সে বড্ড কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। প্রতিবেশীরা কখন ও চায়নি সে লেখাপড়া করুক। বিভিন্ন উপায়ে , পন্থা ওরা বেঁচে নিয়েছে লেখাপড়ায় যাতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে । কিন্তু বন্ধুটি মনের দৃঢ়তা ও অদম্য ইচছা শক্তির মাধ্যমে সকল প্রকার বাঁধা উপেক্ষা করে , কঠিন ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এক মাত্র আল্লাহর সহায়তায় লেখাপড়া করে। তার অংশের সঠিক প্রাপ্যটুকু কখন ও তাকে দিতে চায়নি, দেযনি। জোরপূর্বক , কুটকৌশলে , প্রতারণায় তাকে তটস্থ রাখত। ভয়ভীতি দেখাতো। আমার এ বন্ধুটি লেখাপড়া করলে ও ভুমি সংক্রান্ত বিষয়াদি খুব কমই বুঝত। কিন্তু প্রতিবেশিরা নানাবিধ পন্থায় তার অনেক কিছু গ্রাস করে রেখেছিল। একদিন বন্ধুটি আগ্নেয়গিরি গলিত লাভার মতো বিদ্রোহী হয়ে উঠে। সে এসপার কি ওসপার একটা কিছু দেখতে চায়। জানতে চায়, আগ্রহী হয়ে উঠে। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুকে আপন ভেবে এগিয়ে যায়। কিন্তু বন্ধুটি প্রথমার্ধেই কৌশলে প্রতারিত করতে চায়। তা সে টের পেয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ে। আল্লাহকে ভরসা করে এগিয়ে যায় সম্মুখ পানে।
তার ভুমি দাবিয়ে ভোগ করতেছে প্রতিবেশীরা। এক সময় সে গ্রামের একজন অতি মুর্খ ব্যক্তির সাহায্য কামনা করে। কারন ঐ ব্যক্তির নিকট ঐ মৌজার ম্যাপ আছে বলে বিভিন্নজনের মাধ্যমে জ্ঞাত হয়।ঐ ব্যক্তির কাছে চাহে মৌজার ম্যাপটি একটি ঘন্টার জন্য তাকে প্রদান করতে। সে ফটো কপি করে ফেরত দিয়ে দেবে। লোকটি তাকে আশ্বস্থ করে প্রদানের। বলে আগামীকল্য এসে নিয়ে যেতে। পরদিন এক বুক আশা নিয়ে চলে যায় ব্যক্তির কাছে। চাহিবার পূর্বেই লোকটি বলে ভাই আমার ম্যাপটি উপজেলা পরিষদের তহশীলদার কিছুক্ষণ পূর্বে এসে নিয়ে গেছেন। তাদের কাছে ম্যাপ না থাকায় বড ধরণের একটি অঘটন থেকে রক্ষা পেতে আমার ম্যাপ নিয়ে যায়।বন্ধুটি বুঝে ও না বুঝার অভিনয় করে যেতে থাকে। ঐ ব্যক্তির পিঠ চাপড়িয়ে বার বার বলতে থাকে , ভাই আমার ছোট ও ক্ষুদ্র সমষ্যার চেয়ে বৃহৎ কর্মটি অবশ্যই মঙ্গলজনক।একটি উপজেলার উপকারের স্বার্থের কাছে আমার ব্যক্তি স্বার্থ কিছুই না। আমি ম্যাপ একটি উত্তোলন করে নিতে পারব।বন্ধুটি চলে আসে ঐ ব্যক্তির অভিনয়ে অভিভুত হয়ে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আজ আমার বন্ধুটি তার প্রয়োজনীয় সকল মৌজার ম্যাপ সংগ্রহে রেখেছে। সে দিন অর্থ্যাৎ দুই বৎসরের ব্যবধানে আলোচিত ব্যক্তিটি এসেছেন বন্ধুটির কাছে তার চাহিত মৌজার ম্যাপটি নিতে। সত্য কখন ও হারে না, গোপন হয় না। ভেসে উঠে হয়তবা সাময়িক সময়ের জন্য যায় নিরুদ্দেশের যাত্রী হয়ে। কিন্তু মানুষের অভিনয় দেখতে হলে আপনাকে সংযত হতে হবে। ফলাফল একদিন আসবেই আসবে।সংযম, সবুরের ফলাফল অতি সুমিষ্ট। কুটকৌশল সর্বক্ষেত্রে কুঠিলতায় থাকে আবদ্ধ।
সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here