স্মৃতিরা অনাদরে হাছন রাজার ঘরবাড়ি

0
76
চিত্রঃ হাছন রাজা ও তার বাড়ি।


মিজানুর রহমান মিজান::

গানের রাজা হাছন রাজা। নিজে দালানকোঠা নির্মাণ না করলে ও উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছিলেন দালানকোঠা , জমিদারী, প্রচুর বিত্ত বৈভব। যে কারনে হয়েছে হাছন রাজার ঘরবাড়ি।হাছন রাজার জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেহ কেহ বলেন তিনির জন্মস্থান সিলেটের বিশ্বনাথের রামপাশা গ্রামে। আবার কোন কোন গবেষকের মতে তিনির জন্মস্থান সুনাম গঞ্জের লক্ষণছিরি পরগণার তেঘরিয়া নামক গ্রামে। তবে অনেকের অভিমত সুনাম গঞ্জের লক্ষণছিরি গ্রামে জন্মস্থান।যাই হোক হাছন রাজার নিজের একটি গানে উল্লেখ আছে-“হাছন রাজা মইরা যাব না পুরিতে আশা, লক্ষণছিরি জমিদারি বাড়ি রামপাশা”।এছাড়া রামপাশাস্থ হাছন রাজার বাড়িতে একটি নামফলকে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে “The birth place of the renowned poet dewan hasan raja composer of folklores”rampasha. এ লেখা থেকে আমরা স্পষ্ট একটি নির্দেশনা পাই জন্মস্থান রামপাশা বলে।হাছন রাজা আলী রাজার দ্বিতীয় পুত্র সন্তান।তার মায়ের নাম বেগম হুরমত জাহান এবং বাবার নাম দেওয়ান আলী রাজা।দেওয়ান ও চৌধুরী উপাধি ব্রিটিশ কর্তৃক প্রাপ্ত এবং পূর্ব পুরুষ হিন্দু থেকে মুসলমান হন বলে জানা যায়।হাছন রাজার পিতা ও বড় ভাই তিনির বয়স যখন মাত্র ১৫ বৎসর তখন মারা যাওয়াতে অল্প বয়সে জমিদারীর হাল ধরতে হয়েছে। তিনির পূর্বপুরুষ ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজবেরেলিতে বসবাস করতেন। ষোডশ শতাব্দীতে তার আদি পুরুষ বাংলাদেশের যশোহর জেলার কাগদি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তথায় একটি খন্ড রাজ্য ও প্রতিষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে ও তারা স্থায়ী হতে না পেরে ভাগ্যান্বেষণে সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার কুনাউরা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। অত:পর রামপাশায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন।হাছন রাজার জন্ম সাল হচেছ ১৮৫৪ সাল। আর মৃত্যু সাল ১৯২২ সাল। এখানে লক্ষনীয় একটি বিষয় রয়েছে। ১৮৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্বজাতি কিছু সংখ্যক মীরজাফরের মীরজাফরীতে পরাজয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম হয়।এদিকে হাছন রাজার জন্ম মাত্র তিন বৎসর পুর্বে। আবার মৃত্যুকাল ১৯২২ সালে হলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আসে ১৯৪৭ সালে। সুতরাং হাছন রাজার পুরো জীবনটাই ব্রিটিশ রাজত্বের মধ্যেই কেটেছে।সে সময়ের বেশি সময় ছিল কলকাতা রাজধানী।
গানের রাজা, প্রাণের রাজার বাল্য, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য কেটেছে যে গ্রামের বাড়িতে, যেখানে তিনি রচনা করেছেন কালজয়ী সব মরমী সঙ্গীত বা কাব্যগীতি-সেই রামপাশার বাড়িটি আজ অবহেলা, অযত্নে রয়েছে পড়ে। এক্ষেত্রে তার একটি গানের কলি স্মরণ হল বা রয়েছে-“লোকে বলে বলেরে ঘরবাড়ি ভাল নয় আমার”। হাছন রাজার জীবন বড্ড বৈচিত্রময়। তিনির শৈশব, কৈশোর ছিল অত্যন্ত দুরন্তপনায়পূর্ণ। যৌবন কালের শুরুতেই বেপরোয়া ভোগবাদিতায় কাটে। নারীর প্রতি তার আসক্তি ছিল তার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।তিনির পিতা ও বড় ভাইয়ের মৃত্যু হবার কারনে মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে জমিদারীর হাল ধরতে হয়।অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় অনেকটা বেপরোয়া জীবনের দিকে পা বাড়ান। কিন্তু মা হুরমত জাহান ছেলের বেপরোয়া জীবন সম্পর্কে অবহিত হয়ে তাকে সংযত করার চেষ্টা চালান এবং তিনি সফলকাম ও হন।বুদ্ধিমতী মায়ের এক চমকপ্রদ ঘটনার মধ্য দিয়ে হাছন রাজার জীবনের মোড ঘুরে যায়। সেদিন থেকে হাছন রাজা হয়ে যান পরমাত্মার আরাধ্য সাধনায় লিপ্ত।
হাছন রাজা কয়েকটি বিবাহ করেছিলেন বলে বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায়। একটি সুত্রে জানা যায় পাঁচ স্ত্রীর কথা। তারা হলেন আজিজা বানু, সাজেদা বানু, জোবেদা খাতুন, বোরজান বিবি ও লবজান বিবি। সাজেদা বানুর গর্ভজাত সন্তান হলেন একলিমুর রাজা চৌধুরী। তিনি ছিলেন পরহেজগার মহিলা। এজন্য তিনি একলিমুর রাজাকে তিন বৎসর বয়সের রেখে হজ্জব্রত পালনে মক্কাশরিফে গমণ করেন।সেখানে পাঁচ বৎসর অবস্থান করেন।হাছন রাজার নানার বাড়ি হচেছ ময়মনসিংহ জেলায়।আলী রাজা শশুর প্রদত্ত অনেক সম্পদ লাভ করেন সুনাম গঞ্জ জেলায় হুরমত জাহান বেগমকে বিবাহ করায়।
হাছন রাজার গানের মধ্যে রয়েছে প্রেম বৈরাগ্যতার ভাব ও দর্শন ভাবুকতার প্রচুর ফল্গুধারা।মেলে বৈরাগ্যের সন্ধান।যে কারনে গানের প্রতি মানুষের একটি আকর্ষনবোধ রয়েছে।তাই মানুষের কন্ঠে গীত হয়। অনেক মানুষ ছুটে যান হাছন রাজার স্মৃতিধন্য রামপাশায় দর্শনার্থী হিসাবে। আমার বাড়ির অতি নিকটে হবার সুবাদে সেই শিশুকাল থেকে দেখার সৌভাগ্য রয়েছে।এক সময় আমাদের পোষ্ট অফিস ছিল রামপাশা। পোষ্ট অফিসটি ছিল রাজার বাড়িতেই। ষাটের দশক থেকে চিঠি পত্র আনতে প্রায়ই যাওয়া হত। হাছন রাজার বাড়ির পূর্ব দিকে রয়েছে বিশাল দীঘি। তৎপশ্চিমে পারিবারিক গোরস্তান। তারপর আঙ্গিনা পেরিয়ে অসমাপ্ত বাড়িঘরের চিহ্ন। তার বশত ঘর। আছে বিশাল পুকুর মাদ্রাসা, মসজিদ।উপজেলা সদর থেকে বেশী দুরে নয়। পুরো বাড়িটি পড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্তায়। স্মৃতি ধরে রাখতে তা সংস্কার অতীব জরুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here