নবীজীর দেশে ষোল বসন্ত (৩য় কিস্তি)

0
510

মিজানুর রহমান/লেখক,সাংবাদিক,কলামিষ্ট/বিশ্বনাথ,সিলেট

মিজানুর রহমান মিজান:: সৌদি আরব ও তার পার্শ্ববর্তী দেশ সমুহকে। আমাদের গাড়ি চলছে অনবরত। তার আগে পিছে চলছে গাড়ির বহর। বেলা দ্বিপ্রহরে আমাদের গাড়ি ঢুকলো একটি ফিলিং ষ্টেশনে। উদ্দেশ্য দুপুরের খাবার , জোহরের নামাজ আদায় এবং বিশ্রাম নেয়া। গাড়ির ইঞ্জিণ বন্ধ হতে কেউবা শব্দে হলেন জাগ্রত , আবার কেউবা হলেন ড্রাইভারের ইয়া শেখ ছালাহ (নামাজের আরবী শব্দ) শব্দের চিৎকার শুনে। সবাই জাগ্রত হলে ড্রাইভার বললেন খাবার , নামাজ ও বিশ্রাম নিতে স্বল্প সময়ে। পাঠক আপনাদের হয়ত প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক আমি আবার আরবী ভাষা বুঝলাম কি করে স্বল্প দিনে। এখানে বলতে বাঁধা নেই আমার সঙ্গীয় যারা অনেক দিন এখানে বসবাস করে আরবী ভাষা আয়ত্ব করে নিয়েছেন। তাদের তরজমা থেকে এ সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। তরজমাকারী এবং ড্রাইভারের কথার সঙ্গে এক সাথে সবাই দাড়িয়ে পড়লেন। কারো কারো মনে বাহিরে আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক হাওয়ায় ঘুরে আসা। মনুষ্য বা আমাদের তৈরী জিনিষ যতই আরামদায়ক হোক না কেন খোদা প্রদত্ত বা প্রাকৃতিক দানই হচেছ পৃথিবীর শ্রেষ্টতম এবং সর্বোৎকৃষ্ট দ্রব্য। খোলা মাঠের খোলা হাওয়া , প্রাকৃতিক দৃশ্য বা সৌন্দর্য , যার তুলনা কারো সঙ্গে চলে না।
আমি কোন জার্নিতেই ঘুমাতে পারি না। অনেকে গাড়িতে উঠেই ঘুমে হন বিভোর। বাসের জানালার কাঁেচ চোখ রেখে টায় চুপ করে বসেছিলাম। মনের জানালায় বার বার উঁকি দিচিছল কত স্মৃতি বিজড়িত এ পথ। খোদার অপার মহিমা ও করুণার ফলে আমি ও আজ এ পথের অভিযাত্রী। কিন্তু বিস্তর ফারাক। রাত-দিন , আকাশ-পাতাল। এ ধূ ধূ বিরান বালুকাময় প্রান্তরে একদিন ইসলামের ইতিহাসের কত রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম দিয়ে হয়েছে স্মৃতি বিজড়িত। মক্কা থেকে মদিনায় যাবার মাঝামাঝি স্তানে পড়ে ঐতিহাসিক বদর প্রান্তর। যেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরানো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। যে যুদ্ধকে চিহ্নিত করা হয়েছে যুগ পরিবর্তনের ঘটনা হিসাবে। ইসলামের পবিত্র বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে মাত্র ৩১৩ জন সৈন্যের দল এবং প্রতিপক্ষে এক হাজার সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয়েছিল। জয়ী হয়েছিল মুসলিম বাহিনী। আল্লাহ রাহমানুর রাহিম এর একত্ববাদে বিশ্বাসী ক্ষুদ্র এ বাহিনী হলে ও বিজয় মুকুট ছিনিয়ে এনেছিলেন। বদর প্রান্তরের পাশ কাটিয়েই আমরা এসেছি বা যাচিছ। কিন্তু পূর্বেকার দিনে বদর প্রান্তর দিয়েই যাতায়াত করতে হত। বর্তমানে নুতন হাইওয়ে নির্মাণ হওয়ায় বদর প্রান্তর একটু দুরে থেকে যায়। অর্থ্যাৎ একটু দুর দিয়েই আসতে হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লেন গন্তব্যে পৌছার লক্ষ্যে। সাড়ে চারটার সময় আবার একটি ফিলিং ষ্টেশনে থামলো গাড়িটি। এবার আমরা আছরের নামাজ আদায় করলাম। হাত মুখ ধুয়ে মনটাকে সতেজ আর প্রাকৃতিক কাজকর্ম সেরে নিলেন কেউ কেউ। প্রতিটি মসজিদে পুরুষ ও মহিলার আলাদা ব্যবস্তা করাই আছে। নামাজ শেষ করে পার্শ্ববর্তী রেষ্টুরেন্টে গেলাম চা পান করার উদ্দেশ্যে। চা নাস্তা সেরে গাড়িতে উঠে বসলাম। ১০ মিনিট পরে ড্রাইভার এসে আবার ও গাড়ি ছাড়লেন মদিনা মনোয়ারার দিকে। গাড়িতে অধিক্ষণ বসায় মাথাটা ভারী হয়েছিল। গরম চা পানে অবসাদ কেটে গেল অনেকখানি। আবার শুরু হল আমাদের যাত্রা।
মদিনার প্রায় কাছাকাছি এসে গেলাম। মদিনার উপকণ্ঠে চেকপোষ্ট এ ড্রাইভার সব পাসপোর্ট ও বাস টার্মিনাল থেকে প্রাপ্ত কাগজ সাথে নিয়ে নেমে গেল। একজন পুলিশ পাসপোর্ট না দেখে টার্মিনাল প্রদত্ত কাগজ রেখে বিদায় দিলেন। ড্রাইভার এসে গাড়িতে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিল এবং যার যার পাসপোর্ট যাত্রীরা চিনে চিনে রেখে দিল। কিছুদুর অগ্রসর হয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম আরেকটি ফিলিং ষ্টেশনে। তারপর আবার ও পথ চলা।
মদিনার নিকটবর্তী হয়ে গাড়ি থেকে নামার প্রস্তুতি চলছে। এক সময় গাড়ি থেমে গেল মসজিদ থেকে স্বল্প দুরে। কানে ভেসে এল সুললিত মধুর কণ্ঠের আযান ধবনি। অনুভব আর অনুভুতিতে সহজে বুঝে নিলাম এশার আযান। আমরা ছুটে চললাম মসজিদ পানে বিরতি দিলে জামায়াতের সাথে এশার নামাজ পাব না। সুতরাং সোজা মসজিদে নববীর গেট অতিক্রম করেই অজু খানায় অজু তৈরী করলাম। জামায়াত শুরু হয়ে যাওয়ায় মসজিদের শেষ প্রান্তের কাতারে দাড়িয়ে নামাজ সমাপন করে নিলাম। নামাজ সমাপনান্তে তাসবীহ-তাহলীল , দোয়া-দরুদ পাঠ করতে লাগলাম ভীড় বা লোক সমাগম কমার উদ্দেশ্যে নিয়ে। ২০ মিনিট পর সত্যি কিছুটা কমতে শুরু করেছে বিধায় আমরা ও প্রস্তুতি শুরু করলাম আমাদের প্রিয় নবীর মাজার জেয়ারত এবং সালাম প্রদান , মসজিদে নববী দেখা।
মদিনা শরীফের আরেক নাম হচেছ সোনার মদিনা। আমার মনে হচিছল সত্যিকার অর্থেই দু’জাহানের বাদশাহ আল্লাহর প্রিয় হাবীব এর মসজিদটিকে সোনা দিয়েই নির্মিত হয়েছে। সোনার মদিনা যেমন ম্বর্ণে নির্মিত , তেমনি পৃথিবীর মহামানব সর্বশ্রেষ্ট নবী মোহম্মদ (স:) সেখানেই হিযরতের পরবর্তী জীবন কাটিয়েছেন , শায়িত আছেন। মসজিদের প্রতিটি খাম্বা অর্থ্যাৎ প্রতিটি খুটি আপাদ মস্তক স্বর্ণে ঢাকা (যদি ও কিছু অংশ স্বর্ণ খচিত ছাড়া) খোদা তায়ালার অপার মহিমা বুঝা দায়। কারন মদিনার পরিবেশ মক্কার পরিবেশ থেকে পৃথক বৈশিষ্টপূর্ণ। উল্লেখ্য মদিনার পরিবেশ আলাদা নিরিবিলি পরিবেশ। যা প্রত্যেক মুসলমানের সহজেই অনুভুত হয়। প্রত্যেক মুসলমান শংকিত প্রিয় নবীর মসজিদে , মাজারে এসে কি ভুল , বেয়াদবী করে ফেলি জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে অথবা হয়ে যায়। নিরব নি:স্তব্ধ পরিবেশ। সবাই সতর্কাবস্তায় প্রতিটি পদক্ষেপ যেন গুণে গুণে ফেলছেন। ধীর পদক্ষেপে পায়ে পায়ে অগ্রসর হতে লাগলাম মাজারের দিকে। মাজারের পার্শ্বে সালাম জানিয়ে জেয়ারত শুরু করলাম। জেয়ারত শেষে দাড়িয়ে আছি আমরা আমাদেরই সঙ্গী অপর দু’জনের জেয়ারত শেষ না হওয়ায়। লক্ষ্য করলাম পুলিশের দিকে। একজন সুদানী নবীজির মাজারকে সামনে রেখে সজিদায় পড়ে যাওয়াতে পুলিশ লোকটাকে টেনে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছে এবং ”ইয়া শেখ শিরক্ , ইয়া শেখ শিরক্” এ কথাটি বলছে। লোকটিকে দু’তিনবার দাড় করাবার চেষ্টা করেছে। লোকটি সজিদা করতে পড়েই যাচেছ। শেষ দিকে পুলিশের চোখে জল এসে গেছে। শিরক্ , শিরক্ বলে পুলিশ বার বার তাকে থামাতে পারছে না। এ দিকে আমাদের বিলম্ব হয়ে যাচেছ। কারন পূর্ব থেকে আমরা রাত্রি যাপনের জন্য গৃহ ঠিক করিনি। অনেকে পূর্ব থেকে পরিচিত জনের মাধ্যমে গৃহ ঠিক করে রেখেছেন। অপর দিকে খাওয়া , বিশ্রাম অধিক রাত্রি হলে গৃহ না পাওয়ার আশংকায় চলে আসতে হয়েছিল ইত্যকার দিনের মত। কিন্তু মন চাচিছল না সেখান থেকে আসতে। তবু ও আসতে হবে , আসতে হয়। বের হয়ে সেখান থেকে একটি রুম ভাড়া করে নিলাম। সঙ্গের জিনিষ পত্র রেখে গোসল সেরে খাবার খেতে হোটেলে গেলাম। রাত্রি প্রায় ১২ টায় ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত্রি আড়াইটায় বেয়ারার ড়াকে ঘুম থেকে উঠলাম। বেয়ারাকে পূর্বে বলে রাখায় এ কাজটি করছিল। প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন , হাত মুখ ধুয়ে যাত্রারম্ভ করলাম।
রোড়ের অপর পার্শ্বে অবস্তিত মসজিদে নববীতে। গেট খোলা হল তিনটায়। চতুর্দিকে চেয়ে তেমন লোকজনের সাড়া বা দৃশ্য গোচরীভূত হল না। কিন্তু আশ্চর্যজনক মনে হলে ও বাস্তব সত্য হল গেট খোলার অনুমান ১০ মিনিটের মধ্যেই মসজিদে নববী লোকে লোকারন্য। এত স্বল্প সময়ে মসজিদে নববী মানুষে পরিপূর্ণ। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়লাম। দোয়া-দরুদ , তাসবীহ-তাহলীল , জিকির-আজকার এবং কেউ কেউ নবীজির মাজার জেয়ারতে ব্যস্ত হলেন। মাজারে নামাজের আজান ধ্বনি এক সময়ে মদিনার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে সুললিত মধুর ধ্বনিতে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল। কি আশ্চর্য ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ নিরব নি:স্তব্ধ পরিবেশ। আপনা আপনি প্রতিটি মুসলমানের হৃদয় কুঞ্জবনে আবেগ , আবেশ আর ভাবালুতায় ফেলে দেয়। ফজরের নামাজ আদায় করলাম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব দু’জাহানের বাদশাহ হযরত (স:) এর মাজার জেয়ারত করতে এগিয়ে গেলাম। রাসুল (স:) এর দুই সঙ্গী খোলাফায়ে রাশেদীন এর দুই খলিফা হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রা:) ও হযরত ওমর (রা:) এর কবর জেয়ারত শেষে প্রায় দু’ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমারএক সঙ্গীকে চুপি চুপি জিজ্ঞাস করলাম ৪র্থ কবরের স্তানটি সম্পর্কে। তিনি বললেন , এটা হযরত ঈসা (আ:) এর জন্য রাখা হয়েছে। কিয়ামতের পূর্বে ঈসা (আ:) কে ঐ খালি স্তানে কবরস্ত করা হবে।
ভোরের সূর্য লালচে আভা ছড়িয়ে রাত্রির অন্ধকারকে পিছনে ফেলে দিনের আগমণ বার্তার আভাস দিচেছ। ধীরে ধীরে সময় ও এগিয়ে যাচেছ। আমরা হোটেলে গিয়ে সকালের নাস্তাটা সেরে নিলাম। উদ্দেশ্য অন্যান্য কয়েকটি মসজিদ ও স্তান দর্শনে বেরিয়ে যাওয়া। দিনের আলোয় মদিনার একটি সুন্দরতম পরিবেশ পরিলক্ষিত হল। মসজিদে নববীর পার্শ্বের রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত। রাস্তার অপর পার্শ্বে সুরম্য অট্রালিকা , হোটেল ইত্যাদি রয়েছে। রাসুল (স:) এর মাজার জেয়ারতে আসা হাজীগণ ও জেয়ারতকারী থাকার জন্য হোটেলের কক্ষগুলো ভাড়া করে থাকেন। নাস্তা সমাপ্ত করে হোটেল থেকে বেরিয়েই প্রথমে আমরা মনস্ত করলাম জান্নাতুল বাকী দর্শন ও জেয়ারত করব। তাই মসজিদে নববীর স্বল্প দুরে অবস্তিত বাকী কবর স্তানে পায়ে হেঁটে চললাম। অতি অল্প সময়ে কবর স্তানে পৌছলাম। চতুর্দিকে পাকা দেয়ালে ঘেরা বাকী কবরস্তান। ৪ টি গেইট আছে ভেতরে ঢোকার। কবরস্তানে চলাফেরা করার সুবিধার্থে অনেকগুলো দেড় থেকে দুই মিটার (অনুমান) প্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। আমরা ভেতরে না ঢুকে বাহির থেকেই জেয়ারত সম্পন্ন করলাম। কোন কবরের পার্শ্বে নাম ফলক নেই। যে ওটা বা এ কবরটা অমুকের। শুধুমাত্র কবর বলেচেনার জন্য একেকটা পাথর রাখা হয়েছে কিছু দুরে দুরে। মানুষ যাতে অনায়াসে বুঝতে পারে যে , এটি একটি কবর। পাথর এবং সরু রাস্তা ব্যতীত কবরস্তান সম্পূর্ণ এলাকা সমতল বালুকাময় ভুমি।
জেয়ারত সমাপনান্তে আমরা একটি টেক্সি ভাড়া করলাম। ড্রাইভার হল পাকিস্তানী। কিন্তু একটি টেক্সিতে ৮ জন যাওয়া অসম্ভব বিধায় আরেকটি গাড়ি ভাড়া করতে হয়েছিল। দু’টো গাড়িতে ছুটলাম। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার একটি মসজিদের নিকটে গাড়ি থামিয়ে বলল , এটা হচেছ মসজিদে কু’বা। আমরা নেমে পড়লাম। ধীরে ধীরে অগ্রসর হলাম মসজিদের দিকে। দুই রাকাত নফল নামাজ পাঠ করলাম। মসজিদের আশ-পাশের লাইট পোষ্টগুলো কতই না সুন্দর ? তারই আশেপাশে রয়েছে খেজুর গাছের সারি। এখানে উল্লেখ্য মক্কায় যেতে এত খেজুর বৃক্ষ দেখি নাই। কোথা ও কোথা ও খেজুরের বাগান দেখতে পেলাম। মদিনার খেজুরের একটা আলাদা স্বাদ আছে। এই মসজিদে কু’বা ইসলামের প্রথম মসজিদ। যে মসজিদ রাসুল (স:) নিজ হাতে পাথর বহন এবং নিজে কাজ করে মসজিদটি তৈয়ার করেন। আমরা এখানে অধিক্ষণ থাকতে পারি নাই। ড্রাইভার তাগাদা দিচিছল। যেহেতু সে যত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে ভ্রমণ করিয়ে দেবে, ততই তার মঙ্গল। কারন অর্থ উপার্জন করা তার লক্ষ্য। এখান থেকে আমরা গাড়িতে বসতেই সাঁ সাঁ রবে ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। আমরা মসজিদ-এ-জুমআতে নেমে স্বল্প সময় অবস্তান করলাম। মসজিদে কেবলা তাইন দর্শন শেষে চললাম আমরা মসজিদে সাবাহ দর্শন করতে। যদি ও বলা হয়ে থাকে ৭টি মসজিদ। কি›তু বাস্তবে সেখানে ৬টি মসজিদ দেখেছিলাম। প্রতি মসজিদেও সামনে ফুলের বাগান , সুন্দর মাঠ , কোন কোনটায় উঠার জন্য সিড়ি রয়েছে। তারপর আমরা রওয়ানা হলাম ওহোদের পাহাড় দর্শনে। ওহোদ পাহাড়ের মধ্যখানে সমতল ভুমিতে পাকা দালান বেষ্ঠিত হযরত হামজা (রা:) সহ ৭০ জন সাহাবীর মাজার রয়েছে। সেখানে গিয়ে ইসলামের ইতিহাসের কত কথাই না মনে পড়ে। রাসুল (স:) সহ অনেক সাহাবীর আত্ম-ত্যাগ , ইসলাম এবং মুসলমানদের ঝান্ডা সমুন্নত রাখতে কি নিদারুণ যাতনা , বেদনাপূর্ণ কষ্ট স্বীকার করেছেন। তা স্মরণে দু’চোখে আপনা থেকে পানি ঝরে পড়তে থাকে। কাফেররা কত না কষ্ট দিয়েছে , দিতে চেষ্টা করেছে। আজ আমরা মুসলমান হিসাবে কত না আরাম আয়েশে গাড়িতে বসে এ সব স্তান দর্শন করছি। কিন্তু রাসুল (স:) পায়ে হেঁটে অথবা কখন ও মরুভুমির জাহাজ খ্যাত উটে চড়ে চলেছেন।
সেখানে আজকের আধুনিক আবিষ্কার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানের চিহ্ন ছিল না। খালি পায়ে পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটতে কত না কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। স্মর্তব্য মক্কাবাসীরা যখন রাসুল (স:) কে স্বদেশ , জন্মস্তান পরিত্যাগে বাধ্য করেছিল। মদিনা বাসীরা তখন রাসুল (স:) এর প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত প্রসারিতসহ আত্ম-ত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্তাপন করলেন। আজ ও মদিনা বাসীরা হাজী ও জেয়ারতকারীদের প্রতি সাহায্যে এগিয়ে আসতে দ্বিধা , সংকোচবোধ করেন না। তাঁদের আচার আচরণ ও অনুকরণ যোগ্য।
অত:পর আমরা ড্রাইভারকে বললাম হযরত উসমান গণি (রা:) এর বাড়িটি দর্শন করতে। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। আঁকাবাঁকা রাস্তা কখন ও পাহাড়ের উপর দিয়ে আবার কখন ও পাহাড়ের পার্শ্ব ঘেষে রাস্তা অতিক্রম করতে লাগল। এক সময় খেজুর গাছের নীচে , ছায়ায় গাড়ি থামিয়ে বলল , সম্মুখের বাড়িটি হযরত উসমান গণি (রা:) এর বাড়ি। আমরা নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। সামনে কাটা তারের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা সম্পূর্ণ বাড়ি। ড্রাইভার বলল , বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ। আমার এক সঙ্গী ও জানালেন দু’বৎসর পূর্বে তিনি এখানে যখন এসেছিলেন , তখন কাটা তারের বেড়া ছিল না। বাড়িটি ছিল উম্মুক্ত। কাটা তারের পার্শ্বে দাড়িয়ে বাড়িটির সৌন্দর্য্য এবং বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য অংশ দেখিয়ে দিচিছলেন আমার সঙ্গী। কি সুন্দর খেজুর গাছ পূর্ণ বাড়িটি। এখানে উল্লেখযোগ্য একটি কুপ আছে। কিন্তু তার নাম আমরা জানতে পারলাম না। যেহেতু উহার সঠিক নাম কেউ জানেন না উপস্তিতদের মধ্যে।এখানে প্রায় আধঘন্টা অবস্তান করে মসজিদে নববীর পার্শ্বের হোটেলে ভাড়া করা রুমের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। উত্তপ্ত মরুভুমির উত্তাপ এবং সূর্য্যরে কিরণ খাড়া ভাবে পতিত হওয়ায় গরমে অস্বস্তি বোধ করছিলাম। কিন্তু সঙ্গে থাকা পানি এবং পানীয় জাতীয় দ্রব্য ভক্ষণ করছিলাম। যার যার ইচেছ এবং রুচি মাফিক। রাস্তায় একটি ঘরের পার্শ্বে বালি সঞ্চিত হয়েছে গৃহের চাল বরাবর। এ দৃশ্যের কারণ জিজ্ঞাসা করতে একজন বললেন , এ সব এলাকায় যখন মরুঝড় উঠে , তখন বাতাসে বাহিত হয়ে বালি কোন স্তানে বাঁধা প্রাপ্ত হলে এভাবে বালির পাহাড় জমে উঠে। ঝড়ের পরে বা সুবিধাজনক সময়ে এ বালি সরিয়ে গৃহকে মুক্ত করা হয়। ভূ-পৃষ্টের আকার সর্বদাই পরিবর্তনশীল। ভূ-পৃষ্টের কোন স্তানের অবস্তা চিরকাল এক রকম থাকে না। সর্বত্রই অনবরত পরিবর্তন ঘটছে। উহার কোন স্তানের পরিবর্তন অতি অল্প সময়ে , কোন স্তানের পরিবর্তন ধীর গতিতে দীর্ঘ দিনে সংগঠিত হয়ে থাকে। প্রতি নিয়ত ভূ-পৃষ্টের এ ভাঙ্গা গড়াকে ভূ-ত্বকের পরিবর্তন বলা হয়। অপসারণ পদ্ধতির এ একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত। যাই হোক আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম। মধ্যাহ্ন ভোজ সমাপ্তি করে একটু বিশ্রামের লক্ষ্যে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। গরমের আধিক্যতা থেকে শীতাতপের আরামদায়ক ঘুম চোখে এনে দিল , সাহায্য করল দু’চোখে। হোটেল বয়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। আছরের নামাজ পাঠ করার নিমিত্তে চললাম মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে। অযু আর আনুসাঙ্গিক কাজ কর্ম সেরে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করলাম। নামাজান্তে রাসুল (স:) এর কবর জেয়ারতের জন্য অগ্রসর হতে লাগলাম। কারণ মাগরিবের নামাজের পর পরই আমরা গাড়িতে চড়ব জেদ্দা আসার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। মাগরিবের নামাজের পর জেয়ারত করা হয়ে উঠবে না সময়ের স্বল্পতাহেতু।
জেয়ারত সমাপনান্তে মসজিদ থেকে বের হয়েই মনস্ত করলাম সামান্য কেনাকাটার। স্বর্ণের দোকানের দিকে তাকালে যে দৃশ্য দেখা যায় তা কল্পনাতীত। স্বর্ণ দ্বারা গহনা সাজিয়ে রাকা হয়েছে স্তরে স্তরে। যার পরিমাণ হবে একেকটি দোকানে মন মন। কেনা কাটায় তেমন সময় ও পেলাম না। আবার আমাদের কেনাকাটার সামর্থ অথবা প্রয়োজন ও তেমন ছিল না সে সময়ে। মাগরিবের নামাজটা আদায় করলাম মসি দে নববীতে। কিছু আহার করলাম হোটেলে ঢুকে। তারপরই আমরা যাত্রা শুরু করলাম জেদ্দার দিকে। কিন্তু মন চাচিছল না পবিত্র ভুমি মদিনার মাটি ছেড়ে আসতে। আপনা থেকেই দু’চোখে অশ্র“ ঝরছিল গন্ড বেয়ে। বেহেস্তের একটি অংশ মসজিদে নববীতে আলাদা চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। মনে মনে প্রভুর নিকট প্রার্থনা করতে লাগলাম – হে আল্লাহ দ্বিতীয় বার মদিনার স্পর্শে কবে আসতে পারব তা একমাত্র তুমিই জ্ঞাত। তবে আমার কামনা প্রত্যাশা মদিনাতে রাসুলের (স:) রওজা মোবারক জেয়ারত করার তওফিক দান এবং নছিব করিও।
প্রবাদ আছে , মাছে ভাতে বাঙ্গালী। ইদানিং তা পাল্টে হয়েছে ডাল ভাতে বাঙ্গালী। প্রথম দিকে সৌদি আরবে গিয়ে প্রত্যেক প্রবাসীই খাদ্যের ব্যাপারে বেশ অসুবিধাবোধ করেন। কারন সে দেশে বাংলাদেশের মত মাছ পাওয়া কঠিন যেহেতু মরুভুমি। আমাদের খাদ্য তালিকায় বা খাবারের ব্যাপারে যা সহজ লভ্য ছিল , তাহলো -মোরগ , ডিম , ডাল , সাগরের রুপচাদা মাছ এবং অন্য দেশ থেকে আগত টিনের কৌটায় এক প্রকার মাছ। সুপারী এবং পান সেখানে পাওয়াই যেত না। ১৯৮৩ , ৮৪ , ৮৫ সাল পর্যন্ত কেজি হিসাবে এক প্রকার শুকনো পান পাওয়া যেত। যা খেলে তৃপ্তি পাওয়া দুরের কথা , নামে পান হিসাবে অভ্যাসের কারনে ব্যবহার করা হত। ডিমে আমাদের দেশে যে স্বাদ বা তৃপ্তি মিলে সেখানকার ডিমে তা বুঝাই যায় না। মাছ ফ্রিজে থাকতে থাকতে তরতাজার স্বাদ উধাও। কিন্তু ’৮৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ হতে বিভিন্ন জাতের তরিতরকারি , মাছ রপ্তানি করা হচেছ বিধায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা চাহিদামত বাংলাদেশের সামগ্রী পাচেছন। ইদানিং মিশর দেশের কিছু মানুষ সাগর থেকে দু’তিন প্রকারের ছোট ছোটমাছ তরতাজা ফেরী করে বিক্রি করছে। এ মাছগুলো অবশ্যই সুস্বাদু এবং আমাদেও দেশের মাছের মত স্বাদের দিক দিয়ে। সেখানে যে চাল পাওয়া যায় তা আমেরিকান বেশির ভাগ। এ সমস্ত সিদ্ধ। খাবারের বেলা কোনক্রমেই বুঝতে পারবেন না যে , এ চাল সিদ্ধ। আতপ চালের মধ্যে ইন্ডিয়ান , ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশের স্বল্প চাল পাওয়া যায়। এ ধরণের চাল দামের দিক থেকে একটু বেশি বলে খুব কম সংখ্যক লোক আতপ চাল ব্যবহার করেন।
সৌদি আরবের প্রতিটি স্তানে আযান যখন মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ধবনিত হবে সাথে সাথে দোকান পাঠ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারন সে দেশের রীতি অনুযায়ী আযানের সঙ্গে সঙ্গে দোকান পাঠ বন্ধ রাখতে হয়। নামাজ পড়া বা আদায়ের নিমিত্তে। আবার নামাজ সমাপনান্তে দোকান পাঠ খোলার হিড়িক পড়ে যায়। সিটি কর্পোরেশনের আয়ত্বে ” মুতাওয়া ” নামক একটি আলাদা বাহিনী নিয়োজিত। যদি কেহ নামাজ পড়তে না গিয়ে কাজ বা দোকান পাঠ খোলা রাখেন তা তদারকির নিমিত্তে। তবে ধরে নিয়ে মাথা ন্যাড়া করে কম পক্ষে ঐ ওয়াক্তের নামাজ পড়াবে এবং কিছু শাস্তি প্রদান করে ছেড়ে দেবে। তাছাড়া মুতাওয়াদের নির্দিষ্ট সরকারী গাড়ি দিয়ে ছোট মাইকে ” নামাজ , নামাজ ” বলে সতর্কবাণী দিতে থাকবে। মুসলিম দেশে কত মধুর ও সুন্দর একটি রেওয়াজ অদ্যাবধি প্রচলিত।
সৌদি অধিবাসীদের স্বভাবজাত এবং তাদের জাতীয় পোষাক হচেছ লম্বা ঢিলেঢালা এক ধরণের পাঞ্জাবী। যাকে সে দেশের ভাষায় বলা হয়ে থাকে তোব। অনেকটা মেয়েদের বোরকার মত। শুধু গলা থেকে উপরের অংশ খোলা , নীচে একটা আন্ডার ওয়ার থাকে। মাথায় থাকে সুন্দর একটি রুমাল। তার উপরে কাল রং এর একটা বেঢ়ী পরিধান করে থাকে। আপনি মসজিদ-মাদ্রাসা , হাট-বাজার বা রাস্তায় তাকালে দেখবেন যেন সাদা সাদা এক ঝাক বকের সারি চলা ফেরা করছে। দৃশ্যটা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ছোট বড় সকলেই এ জাতীয় পোষাক পরিধান করে থাকে। মেয়েদের একটা নাইটির মত পোষাক পরে গৃহে থাকেন। বাহিরে বের হলেই তার উপরে বোরকা পরিধান করে বের হবেন। বোরকা সম্পূর্ণ কাল রঙ্গের।
আমাদের দেশে গোত্র বা কোন কোন সময় কয়েক গ্রামে সম্মিলিত ভাবে ঝগড়া বিবাদে জড়িত হয়ে যান। কিন্তু সেখানে যদি দু’ব্যক্তি ঝগড়ায় লিপ্ত হন , তবে একজনের সহোদর ভাই উপস্তিত থাকলে ও ভাই এর পক্ষ অবলম্বন করে ফ্যাসাদে জড়াবে না। অর্থ্যাৎ পক্ষাবলম্বন প্রবণতা নেই। ভাই অথবা যে কেউ দেখবে ঝগড়া হচেছ সাথে সাথে টেলিফোন করে থানায় জানাবে। তৎক্ষণাৎ পুলিশ এসে ঝগড়ায় লিপ্ত উভয়কে ধরে নিয়ে যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে উভয়কে সমঝোতার , আপোষের সুযোগ দেবে। মীমাংসা হলে তো কথাই নেই। যদি আপোষ না হয় বা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার না করেন। সাথে সাথে বিচার কার্য শুরু করে যাকে যতটুকু দোষের বা অপরাধের , অভিযোগের অভিযুক্ত করে শাস্তি প্রদান করে ছেড়ে দেবে। জেল হলে জেলে প্রেরণে বিলম্বতা নেই। সেখানে বিচারের নামে প্রহসন , দীর্ঘ সুত্রিতা , স্বজন প্রীতি নেই। কোট কাচারী , দৌড়াদৌড়ি নেই। তারিখের পর তারিখ ও নেই। সর্ব মোট এক বা দুই তারিখ। সৌদি আরবের অধিকাংশ নাগরিক পুলিশের চাকুরীতে নিয়োজিত। ডিউটি শেষ হবার সাথে সাথে প্রত্যেকের সঙ্গে পিস্তল বা রিভলভার সঙ্গে নিয়ে বাসায় বসবাস করে। থানায় জমা দিয়ে আসতে হয় না। কিন্তু বাসায় পিস্তল থাকা সত্তে¡ ও যদি সে ঝগড়ার সম্মুখীন হয় , তবে ভুলে ও পিস্তলের দিকে হাত বাড়াবে না। অথবা ঘরে রক্ষিত পিস্তলের প্রতি অন্যান্য সদস্যরা যত বড় বিবাদ-বিস্বাদের সম্মুখীন হউক না কেন তা ব্যবহারে লক্ষ্য নেই , উদ্দেশ্য নেই , থাকবে না। যেন বীরত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্র নেই। কথায় কথায় লোভে বক্ষের রক্ত পিপাসায় প্রচন্ড উম্মাদনা হাতিয়ার নিয়ে বের হওয়া বড়ই বেদনার কথা।
”পুলিশ জনগণের বন্ধু , জনগণের রক্ষক” -এ নীতি বাক্য পুলিশ অক্ষরে অক্ষরে কর্তব্য ও দায়িত্ব বোধ পালনে অনস্বীকার্য। নির্দিষ্ট সময়ে দায়িত্ব পালন এবং নির্দিষ্ট সময়ে কর্তব্য কাজ সমাপনান্তে ছুটি গ্রহণ করবে। নয়টার গাড়ি কয়টায় ছাড়বে এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না , হয় না। যদি কোন বিদেশী রাস্তা বা গন্তব্য স্তানে পৌছার পথ হারিয়ে পুলিশের সাহায্য কামনা করেন। তবে সেখানকার পুলিশ যে ভাবেই হোক আপনাকে সাহায্য সহযোগিতা করে গন্তব্য স্তলে পৌছে দেবে , পৌছার ব্যবস্তা করে দেবে।
প্রায়ই খবরে বা লোক মুখে শুনি মানুষ কর্তন করা হয়। বাস্তবে তা প্রত্যক্ষ করার অদম্য স্পৃহা জেগে উঠল। কিন্তু কখন , কোথায় , কি ভাবে কর্তন করা হয় তা আমাদের জানতে পারা সহজ ব্যাপার নয়। অর্থ্যাৎ কর্তনের খবর টেলিভিশন , রেড়িও বা খবরের কাগজে বলা হয়শুধু অমুখ দিন ২/১ জন লোকের মাথা কাটা হয়েছে। প্রবাসীরা তা জানার কোন উপায় নেই। যা হোক একজন আরব বাসীর গৃহে কাজ করার সুবাদে পরিচিতির মাধ্যমে আমার আকাংখার কথা ব্যক্ত করলাম। সে ব্যক্তি বলল , ঠিক আছে , সময় সুযোগে তোমাকে বলবো , দেখে আসবে কর্তনের দৃশ্য। আমি অপেক্ষায় রইলাম। হঠাৎ এক শুক্রবারে ভোর বেলা এ ব্যক্তি এসে বলল , অদ্য জুমার নামাজের পর পরই লোহিত সাগরের অনতি দুরে ”বলদ” নামক জেদ্দা শহরের একটি মসজিদের উত্তর পার্শ্বের খোলা মাঠে ছয়জন লোকের মাথা কাটা হবে। জীবন চলার পথে পূর্বে বলা কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তার কথায় আমার দৃশ্যটা অবলোকন করার কথা তীব্র ভাবে মনে দোলা দিতে লাগল।
আমি আগন্তুক ব্যক্তিকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে বন্ধু স্তানীয় ছিদ্দিক আলী সাহেবের বাসায় চলে গেলাম সঙ্গী সংগ্রহার্থে। ছিদ্দিক আলী সাহেব (চুনারু ঘাট নিবাসী) যাওয়ার মতামত ব্যক্ত করে বললেন , আমরা সর্বমোট ৪ জন যাব দৃশ্য অবলোকনে। আমি ঐ দিনের কাজ কর্ম বাদ দিয়ে যাবার প্রস্তুতি পর্ব চালালাম। যাতে সঠিক সময়ের কিছুক্ষণ পূর্বে মসজিদে গমণ করে জুমআর নামাজ সমাপ্ত করে বাস্তব বা প্রত্যক্ষ দর্শীর খাতায় নাম লিখাতে পারি। খলিল , ময়না , ছিদ্দিক ও আমি একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে সকাল ১১ টায় রওয়ানা দিলাম লোহিত সাগর তীরে অবস্তিত মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বস্ত মাঠে , যেখানে কর্তন করা হবে মানুষ। পৌণে ১২ টায় গিয়ে পৌছলাম কাংখিত মসজিদের সম্মুখে। গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম সময় আমাদের হাতে রয়েছে। সুতরাং মাঠটি ঘুরে দেখার বাসনাকে সংযত রাখতে পারলাম না। মাঠের চতুর্দিকে লোহার খুটি বসিয়ে কোমর অবধি বেষ্টনী স্তাপন করা আছে। যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ঢুকতে না পারে। দু’দিকে দু’টি গেইট আছে অনায়াসে পুলিশের গাড়ি আসা যাওয়া করতে পারে। মাঠের পূর্ব দিকে শুধু উপরে ছাদ দিয়ে গৃহ মত করে তৈরী একটা অংশ রয়েছে। অনুমানে বুঝলাম এ স্তানে কর্তন কার্যকর করার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বসার জন্য নির্দিষ্ট স্তান। ঘড়ির কাটা ঠিক ঠিক শব্দে অগ্রসর হচেছ। নামাজের জন্য মসজিদে ঢুকে পড়লাম। নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে একটা প্রতিযোগিতা যেন শুরু হল কার আগে কে যাবে এবং সামনের স্তানটি দখল করতে পারবে। তবে আমাদের দেশের মত হৈ-হুল্লোড় , ধাক্কাধাক্কি নেই। প্রতিযোগিতা হলে ও একটা শান্তনার পরশ যেন লেগেই আছে আপনা থেকে। ভাগ্য ভাল , একেবারে সামনের একটি সীট দখল করতে পেরে মনে মনে ভাবলাম পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করা যাবে কোন প্রকার বাঁধা ছাড়া। এরমধ্যে একটা দু’টো পুলিশের গাড়ি আসা যাওয়া করছে। কিন্তু কেহই বলতে পারবে না সুনির্দিষ্ট করে কি ভাবে , কখন বাস্তবায়িত হবে মানুষ কর্তনের কাজটি। এরই মধ্যে এক সাথে ৪/৫ টি গাড়ি আগে পিছে এসে মাঠে ঢুকে পড়ল। গাড়ি থেকে শুধু পুলিশের পোষাকধারী বেশ কিছু লোক নেমে পড়ল। পাঠক প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক , যে পুলিশের গাড়ি অনেক এক সাথে বাঁশী বাজিয়ে আসবে। না , আমাদের দেশে একজন মন্ত্রীর আগমনে কম পক্ষে আধঘণ্টা পূর্ব থেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে তা থেকে অনুমিত হয় একজন কর্তা আসছেন। কিন্তু সেখানে তার বিপরীত অবস্তা বিরাজমান। বাদশাহ যদি একটি রাস্তা দিয়ে যান , তবু ও সেখানে রাস্তা বন্ধ , তোড়জোড় থাকবে না। স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই সব পরিচালিত হবে।
শুধু বাদশাহর গাড়ির সামনে পিছনে কয়েকটি পুলিশের গাড়ি দেখতে পাওয়া যাবে। বস্ এ পর্যন্তই। জনগণ ও ভীড় করবে না। কখন বাদশাহর গাড়ি যায় বা যাবে। পুলিশকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িগুলো পূর্ববৎ চলে গেল। ১০/১৫ মিনিটের মত হবে আর কোন কিছুই নেই। তারপর আবার ও ৪/৫ টি গাড়ির আগমন। গাড়ি থেকে পুলিশ নামছে। সঙ্গে সাদা পোষাকধারী কিছু লোক নামতে দেখা গেল। একটি গাড়ি থেকে দু’জন পুলিশ জায়নামাজ হাতে নেমে মাঠের এক স্তানে কিবলামুখী করে বিছিয়ে রাখল। এ ভাবে সর্বমোট ছয়খানা জায়নামাজ বিছানো হয়। তারপর আলাদা একটি গাড়ি থেকে দু’জন পুলিশ দু’হাতে ধরে একজন লোককে পিছনে হাত বাঁধা অবস্তায় ধীরে ধীরে জায়নামাজে নিয়ে নামাজের তাশাহুদ পাঠের ভঙ্গিমায় কিবলামুখী করে বসিয়ে দিল। এ ভাবে দু’জনকে নামানো হল এবং বুঝতে পারলাম পিছমোড়া হাত বাঁধা , সাদা কাপড়ে চোখ বাঁধা লোক গুলোর মাথা কর্তন করে দ্বিখন্ডিত করা হবে। মানুষের মুখ থেকে সর্বদা শুনতাম জল্লাদের প্রতি ৪/৫ জন পুলিশ বন্দুক তাক করে ধরে রাখে। যদি সে আসামী কর্তন করে ভাল লোক কর্তনে উদ্যত হয় , তাহলে গুলি করে তৎক্ষণাৎ তাকে প্রাণে মারার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত রাখা।
এ উদ্যোগ পূর্ব থেকে সতর্কাবস্তা। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম তার উল্টো। একজন দীর্ঘদেহী লোক লম্বা সাদা শাণিত তরবারী হাতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভাবে ঘুরাফিরা করছে। তার মধ্যে বিন্দু মাত্র অস্বাভাবিকতা নেই। প্রথমে ধরেই নিয়েছিলাম হয়ত সময় মত তরবারী খানা জল্লাদের হাতে তুলে দেবার বাসনায় বা অপেক্ষায় লোকটি ঘুরাফিরা করছে।

মোবা ০১৭১২-৮৭৯৫১৬।
লেখক মিজানুর রহমান মিজান সভাপতি বিশ্বনাথ সিলেট। মোবা ০১৭১২৮৭৯৫১৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here