নবীজীর দেশে ষোল বসন্ত পর্ব ২

0
466

মিজানুর রহমান মিজান:-২য় কিস্তি।
অমানসিক পরিশ্রমের পর কতটুকু সময় থাকে একজন প্রবাসীর পত্র লেখার তা কেউ অনুধাবন করে না। সেই সাথে মনমানসিকতা। প্রবাসীদের আসল লক্ষ্যই হলো পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটানো। আর্থিক স্বচছলতা আনয়নের মধ্য দিয়ে। কিন্তু অভিযোগ বিপরীত থাকে। সকল প্রবাসীরা নিয়মিত পত্র রচনায় অলস। এখানে যদি স্বদেশের কেউ অনুপ্রেরণা , উৎসাহ , উদ্দীপনা যোগান দিয়ে কর্ম পরিশ্রান্ত প্রবাসীকে শান্তনা বা আশ্বাস বাণী শুনাত , সেটা হত মঙ্গলজনক। আপনজন ভালবাসার ডালি দিয়ে বরণে মরুদ্যানকে সজীবতা দিয়ে সুশোভিত হত। সুতরাং আপনজনদের প্রতি প্রত্যাশা একান্ত , এক গুয়েমি প্রতিরোধ স্পৃহা পরিহার করুন। প্রবাসীদের অবস্তা বিবেচনায় এনে ভালবাসা দিয়ে ভরে দিন আপনার আপনজনের হৃদয়। এখানে পত্রই দিতে পারে ক্ষণিকের সুখ। কামনা থাকবে সকলের জীবনে আসুক হাসি , আনন্দ আর উচছাস।
প্রবাসীরা এক রুমে পাশাপাশি থাকে সঞ্চয়ের একটা প্রধান হাতিয়ার মনে করে। কারণ মাসিক বাসা ভাড়া যাতে অংশে কম পড়ে। সেহেতু এ পদ্ধতি গ্রহণ করে প্রত্যেক প্রবাসী। বিকাল ৪ টার দিকে আমার ঘনিষ্টজন জানিয়ে দিলেন মাগরিবের নামাজের পর পরই পৃথিবীর পবিত্রতম স্তান মক্কা মোকারমায় যাব ওমরাহ হজ্জ পালন করতে। দীর্ঘ দিন ধরে সেখানে বসবাসরত এক ব্যক্তিকে সঙ্গে দিলেন পথ নির্দেশক রুপে। মনের মধ্যে একটি আলাদা অনুভুতির জন্ম হল। দেখতে যাব যে ভুমিতে রাসুল করিম (সা:) জন্ম লাভ করেছিলেন। যে ভুমি তিনির শৈশব , কৈশোর ও যৌবনের সাহচর্য লাভ করে সম্মানিত হয়েছিল। যে ভুমি তাঁর পবিত্র পদ চারণায় সৌভাগ্য মণ্ডিত হয়েছিল। যে ভুমির আকাশ-বাতাস আজ ও তাঁর আজন্ম সততার ও বিরল মহানুভবতার সাক্ষী হয়ে তাঁরই গুণগান কীর্তন করছে। যে মহামানুষ এখানকার শত্র“দের অত্যাচারে উৎপীড়িত হয়ে এখান থেকে হিযরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনিই এখানে যখন বিজয়ীর বেশে পুনরাগমন করত: পৌত্তলিকতাকে ধুলিসাৎ করে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করেন। তখন কারো উপর ছিল না তাঁর কোন আক্রোশ। কারো বিরুদ্ধে তিনি গ্রহণ করেননি প্রতিশোধ। তিনি ক্ষমা ও মহত্তে ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন। সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য কৃপা স্বরুপ। সেই পবিত্র ভুমিতে যেতে মনের মধ্যে আলাদা এক অনুভুতিতে ভরে উঠছিল। আল্লাহ তাঁর রাসুল (স:) এর প্রেমে উদ্ভাসিত এ এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দা বলে বিবেচিত হচিছল। গোসল সেরে নতুন এক সেট ওমরাহ হজ্জের কাপড় পরিধান করতে সহায়তা করছিলেন আমার এক অগ্রজ আলাউদ্দিন। দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম মহান রাববুল আলামিনের উদ্দেশ্যে। চিত্ত হল অভাবনীয় তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। শুরু করলাম তালবিয়া লাববাইকা …। বাসায় অবস্তানরত এবং অন্যান্য বাসা থেকে আগত সবার সাথে মুছাফাহ করে ৭ জনের কাফেলা চললাম গাড়ির উদ্দেশ্যে। কারণ বাসার অল্প দুরে রাস্তা। সেখানে দাড়ালে পাওয়া যাবে অনায়াসে মক্কা যাত্রার যন্ত্রযান। কাফেলার সবার পরণে একই পরিধেয়। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। অনুমান অর্ধ কিলোমিটার দুরে মক্কার রাস্তা। অগণিত বিভিন্ন আকারের গাড়ি সাঁ সাঁ রবে দু’দিকে ছুটে চলেছে। রাস্তায় দাড়াতেই মাঝে মধ্যে দু’একটি গাড়ি থামিয়ে আমাদেরকে জিজ্ঞাস করছিল মক্কা যাবার। কিন্তু গাইড এ সমস্ত গাড়িকে না বাচক জবাব দিচিছলেন। এ ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হচিছল না। পরে অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদে জানলাম প্রাইভেট গাড়িতে করে গেলে ভাড়ার ক্ষেত্রে একটা পার্থক্য রয়েছে। মক্কা যাবার নির্দিষ্ট টেক্সী আছে। তাছাড়া কোচ ও রয়েছে। সর্বনিম্ন ভাড়া হল কোচে। সুতরাং একটি কোচে চড়েই আমাদের যাত্রা আরম্ভ হল।

রাস্তার উভয় পার্শ্বে যত দুর চোখ যায় , দৃষ্টিতে ভাসে শুধু বালি আর বালি এবং উচু নীচু , ছোট বড় পাহাড় আর টিলা। কোন কোন পাহাড়ে মস্ত বড় পাথর দেখতে মনে হয় তামাটে কালচে এ পাথর খণ্ডটি এ মুহুর্তে খসে পড়বে। কিন্তু শত শত বৎসর অতিক্রান্ত হচেছ পাথর এভাবেই রয়েছে , আছে ও থাকবে। খোদার এ কি সৃষ্টির অপূর্ব এ লীলা খেলা। একবার আকালেই সৃষ্টির অপার মহিমা সম্বন্ধে ভাবনার সাগরে ডুব দিতে হয়। নেই কুল কিনারা। আল্লাহই সব জান্তা।
রাস্তার উভয় পার্শ্বে কিয়ৎ দুরত্বে আধুনিকতার ছোঁয়াছে স্তাপন করা হয়েছে ফিলিং ষ্টেশন এবং ষ্টেশন সংলগ্ন মসজিদ , সুপার মার্কেট। দুর পাল্লার যাত্রীরা এখানে বিশ্রাম , নামাজ , কেনাকাটা করে থাকেন। রাস্তÍার মধ্যখানে আইল্যান্ড রাখা হচেছ , তাতে রোপন করা হচেছ গাছের চারা। একটি ব্যাপার আমাকে ভাবনায় ফেলে দিল। তথা আমি অনেক চিন্তা করে তার সঠিক হিসাব মিলাতে পারিনি। তা হলো অধিকাংশ চারা হচেছ নিমের গাছ। আর ধূ ধূ বালির মধ্যে অন্য কোন উদ্ভিদ দেখা যায় না। এক জাতীয় গাছ দৃষ্টি গোচরীভূত হয়। অল্প দুরে দুরে যার পাতাহীন মৃত মত কাটাযুক্ত। একজনকে জিজ্ঞাসায় জানলাম গাছটির নাম নাকি বাবুল গাছ।
অকস্মাৎ সম্মুখের গাড়িগুলো যেন থেমে গেল। আমাদের গাড়িটি দণ্ডায়মান। আমরা পৌছে গেছি চেক পোষ্টে। এখানে বৈধ যাত্রীদের পবিত্র মক্কা প্রবেশের অধিকার রয়েছে। অনেকজন পুলিশ প্রতিটি গাড়ির লাইসেন্স এবং প্রত্যেক মানুষের বৈধতা চেকিং করে ছেড়ে দিচেছ। আমাদের গাড়ি এগোতেই প্রত্যেকের পাসপোর্ট দর্শন করে ছেড়ে দেয়া হল। এক সময় আমরা কাবা গৃহের সুউচচ মিনার দেখে বুঝলাম সন্নিকটে কাবা গৃহ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ড্রাইভার গাড়ি থামাল। আমরা একে একে সবাই নেমে পড়লাম। সে সময় একমাত্র আল্লাহ , রাসুল (স:) এর নাম ব্যতীত এ পৃথিবীর কোন কিছুই বা কিছুর প্রতি লক্ষ্য ছিল না।আমাদের গাইড় হাটছেন। আমরা তাকে লক্ষ্য করে পিছনে ছুটলাম। কয়েক গজের ব্যবধানে একটি সিড়ি বেয়ে নীচে নামতেই দেখলাম শত শত মানুষ কেউ অজু শেষে বের হচেছ , কেউ ঢুকছে। গাইড় এক সময় বললেন , এ অজুখানা আর টয়লেট হচেছ আবু জেহেলের বাড়ি। অর্থ্যাৎ তিনি আজীবন ইসলাম এবং রাসুল (স:) এর বিরোধিতা , নানা প্রকার ষড়যন্ত্র করেছেন। আজ তার বাড়িতেই শত শত টয়লেটে পরিপূর্ণ করা হয়েছে। কেউ না বললে এটি কোন মতেই কেহ অনুমান করতে পারবে না। এখানে একদিন বাড়ি ছিল। ছিল মানুষের বসত গৃহ। আমরা অজু শেষে বের হয়ে ধীর পদক্ষেপে মসজিদ পানে ছুটলাম। এক সময় বাবে ওমরাহ অর্থ্যাৎ ওমরাহর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। কত সুন্দর ও স্তাপত্যে মসজিদ নির্মান করা হয়েছে। স্তানে স্তানে কোরআন , মানুষের পানের জন্য পানি রাখা হয়েছে। গরমে অতিষ্টিত ও ক্লান্তি যেন একটু এসে গেছে। তাই পানি পান করতে লাগলাম। বেশ কিছু স্তান অতিক্রম করে মসজিদের শেষ প্রান্তে আবার সিড়ি বেয়ে নীচে নামলাম খোলা মাঠে। যে মাঠের মধ্যখানে কাবা গৃহ , হজরে আসওয়াদ। কাবা গৃহ এবং মসজিদের মধ্যখানে এ খোলা মাঠ। এ মাঠে কাবা গৃহের চতুর্দিকে ৭ বার প্রদক্ষিণ করে ওমরাহ বা হজ্জ পালন করতে হয় নারী পুরুষ নির্বিশেষে। আমরা মোকামে ইব্রাহিমকে সামনে রেখে দু’রাকাত নামাজ পাঠ করলাম। নামাজ পাঠান্তে লম্বা একজন আরববাসীর সাথে আমাদেরকে (মুয়াল্লিম) গাইড় দিলেন তিনির সাথে যেয়ে ৭ বার প্রদক্ষিণ করতে। যে দোয়া দুরুদ পড়তে হয় তিনি উচচ স্বরে বলতে লাগলেন। আমরা পাঠ করে করে একেবারে শেষের বেলা হজরে আসওয়াদে চুমু খেতে মুয়াল্লিম নির্দেশ দিলেন। লাইনে দাড়িয়ে পড়লাম। আধ ঘন্টা পর আমি সুযোগ পেলাম চুমু খেতে। এর আগে প্রত্যেক প্রদক্ষিণেই আমরা হজরে আসওয়াদের প্রতি লক্ষ্য রেখে হাত বরাবর চুমু খেয়েছি। প্রতি প্রদক্ষিণে চুমু খাওয়ার নিয়ম হলে ও অপর মানুষকে ধাক্কা বা অসুবিধা দিয়ে চুমু খাবার পরিবর্তে ইশারায় দুর থেকে চুমু খেলে ও হবে বিধায় শেষ চক্করে শুধু চুমু খেলাম। কারন লোকজনের অনেক ভীড় ছিল। কাবা গৃহের দরজা ধরে মানুষ কাঁদছে। আমরা ও কাঁদলাম। অবশেষে আরো দু’রাকাত নফল নামাজ পাঠ করে আমাদের গাইড় যেখানে দণ্ডায়মান সেখানে চলে গেলাম। আসতেই গাইড় আমাদেরকে নিয়ে মসজিদ সংলগ্ন বাহিরে চলে আসলেন সাফা মারওয়াতে সায়ী করতে। সায়ী শেষে আমরা চললাম জমজমের পানি পান এবং গোসলের ন্যায় সমস্ত শরীর ধৌত করতে। মহিলা এবং পুরুষের জন্য পৃথক ব্যবস্তা রাখা হয়েছে। আমরা ঢুকে পড়লাম সিড়ি বেয়ে খোলা মাঠের এক প্রান্ত দিয়ে। ইচছা মত পানি পান করলাম। তারপর মসজিদের বাহিরে এসে চুল কাঠতে হয়। কিন্তু সেখানে প্রচুর ভীড় এবং পুলিশের ভয়ে তিনটি (কোচ) কাটা দিয়ে একজন ছেলে বয়সী কাচি (কাঞ্চি) লুকিয়ে টাকাটা নিয়েই উধাও হয়ে যায়। কিন্তু সে দুরে কোথায় ও যায় না , অতি কাছেই থাকে। দেখে তাকে সহজে আপনি বুঝতে পারবেন না , মিনিট পূর্বে সে চুল কাটার ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল।
আল্লাহ মহান রাববুল আলামীনের সৃষ্টি সম্পর্কে বুঝা আমাদের মত সসীম ও ক্ষুদ্র জ্ঞানের দ্বাজহরা বুঝা সাধ্যাতীত। আমার একটি জিনিষ নজরে পড়ল , এক জাতীয় ক্ষুদ্র পাখি যা আমাদের দেশের চডুই পাখি থেকে আকারে ছোট। পাখিটি এত দ্রুতগতিতে আসে দেখে যেন মনে হয় সে দিক পরিবর্তন করতে পারবে না। কাবা গৃহের উপর দিয়ে এক্ষুনি চলে যাবে। কিন্তু কাবা গৃহের দেয়াল বরাবর এসে দিক পরিবর্তন করে উত্তর-দক্ষিণ , পূর্ব-পশ্চিম যে কোন দিকে চলে যায়। কিন্তু কাবা গৃহের উপর দিয়ে কখন ও অতিক্রম করে না। এটা আমি যতবার ওমরাহ করতে গিয়েছি , ততবার লক্ষ্য করেছি।
মসজিদের সম্মুখ ভাগে তুর্কি শাসন কর্তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে পূর্বের ছোট ছোট গম্ভুজ গুলোর কোন পরিবর্তন আনা হচেছ না। যদি ও মসজিদের অভ্যন্তর ভাগ এবং স¤প্রসারণ কাজ অনবরত প্রতি বৎসর করা হচেছ। প্রথম দিকে ’৮৩ সালে হেরাম শরিফের গা ঘেষে একটি মার্কেট দেখতে পেয়েছিলাম। দু’তিন বৎসরের মধ্যে সৌদি সরকার তা ভেঙ্গে মসজিদের স¤প্রসারণ কাজ করে ’৯৭ সালে চর্তুদিকের মার্কেট , বাসা বাড়ি ভেঙ্গে লোকের নামাজ পড়ার স্তান বৃদ্ধি করে চলেছেন। এক কথায় প্রতি নিয়ত চলছে স¤প্রসারণ কাজ। পূর্বে শুনতাম লোক মুখে মানুষ মরুভুমির জাহাজ বলে খ্যাত উট বা পায়ে হেঁটে ওমরাহ বা হজ্জ পালন করতেন। কালের প্রবাহে সব কিছু বিলীন হয়ে আসছে নিত্য নতুন যন্ত্রযান , রাস্তা-ঘাট এবং আধুনিক স্তাপত্যের নিদর্শন। কাবা গৃহের চারপাশে খোলামাঠ ছিল বালিতে পূর্ণ। আজ সেখানে লাগানো হয়েছে এক জাতীয় টালি (বালাদ আরবী নাম) যা মরুভুমির এত উত্তাপ এবং সূর্য্যরে প্রখর তেজে ও তা গরম হয় না। দিবারাত্রি থাকে শীতল। মানুষের পায়ে পড়ে না ফুসকা। দুপুরের প্রখর থেকে প্রখরতম রৌদ্রেও। মোকামে ইব্রাহিম ছিল খোলা। আজ তা গ্লাস দিয়ে বেষ্টনী করে রাখা হয়েছে। সুদীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে পরিদৃষ্ট হল , যা তা হচেছ নামাজ ব্যতীত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক মিনিট থাকে না মাঠটি শুন্য যে লোকে প্রদক্ষিণ করছে না। অর্থ্যাৎ প্রত্যেক ওয়াক্তের ফরজ নামাজের জামায়াত এর সময়টুকু ব্যতীত কম বেশী লোক ওমরাহ পালনের নিমিত্তে কাবা গৃহে প্রদক্ষিণ করছে।
আমরা ওমরাহ হজ্জ পালন শেষে কাবা গৃহের আঙ্গিনা হতে বের হয়ে আসলাম। এতক্ষণে পেঠে অনুভব করলাম ক্ষুধা লেগেছে। একটা দোকান থেকে গাইড় স্যান্ডুজ ক্রয় করলেন এবং ভীড়ের জন্য এ দোকান থেকে পানীয় ক্রয় না করে অল্প দুরের অন্য একটি দোকান থেকে পেপসির ক্যান ক্রয় করে খেতে শুরু করলাম। আহারান্তে গাড়িতে চড়লাম বাসার উদ্দেশ্যে। রাত্রি সাড়ে বারোটায় এসে পৌছলাম। মাথা মুণ্ডন করে গোসল সমাপ্তি। তারপর আহার করে ঘুমে হলাম বিভোর।
দুই তিন দিন অতিক্রান্ত হল বাসায়। সকালে চলে যান কেই কাজে আর কেউ বা কাজের উদ্দেশ্যে। আমরা যারা নূতন তারা বাসায় বসে , শুয়ে দিনাতিবাহিত করতে শুরু করলাম। এছাড়া আমাদের করার কিছুই ছিল না। একদিকে না জানি সে দেশের ভাষা , না আছে জানা শুনা লোক। পুরাতনদের নিকট থেকে শিখতে লাগলাম গণনা। সঙ্গে প্রয়োজনীয় আরবী ভাষা যা নিত্য দিনের সঙ্গী হবে। এমতাবস্তায় ২০ দিনের দিন আমার এক ক্লাসমেট দাওয়াত করল তারই স্পন্সরের বিয়েতে। স্পন্সর দাওয়াত না করায় যেতে দ্বিধা , সংকোচ আসলে ও সেদেশের বিয়ের রীতিনীতি , তাদের সংস্কৃতি দেখার উদগ্র বাসনা নিয়ে দাওয়াতে চলে গেলাম।
মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম স্তান হচেছ সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা শহর। এদেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের , বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের লে কের বসবাস। ভিন্ন ভিন্ন দেশের লোকের সমাগম হলে ও সেখানকার রাষ্ট্রীয় এবং প্রধান ভাষা হচেছ আরবী।
আরবী রীতি অনুযায়ী বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর , আত্মীয় বা পরিচিতদের অনেক দিন পরে সাক্ষাৎ হলে ওরা সর্ব প্রথম ” আসসালামু আলাইকুম ” বলে। তারপর ”কেইফা হালুক ”(কেমন আছেন) বলে করমর্দন করে এবং সাথে সাথে উভয়ে উভয়ের গালে কয়েকবার চুম্বন করে। চুম্বনের নিয়ম পুরুষে পুরুষে , মেয়ে মেয়েতে সীমাবদ্ধ। ওরা পারিবারিক বা অনুষ্ঠান জলসায় একই রীতি পালন করে। বিদায় বেলা ” মাচছালামা ” বলে বিদায় নেয় অথবা দেয়। দুর থেকে ডান হাত নেড়ে বন্ধুকে সম্ভাষণ করে এবং কোন বিদেশীকে অভ্যর্থনা জানাতে হলে ”রফিক” শব্দটি ব্যবহার করে। কোন কাজের ভাল ফল বুঝাতে হলে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উচিয়ে দেখিয়ে ” মন্তাজ ” শব্দটি উচচারিত বা ওকে শব্দটি ইউরোপিয়ান ষ্টাইলে ব্যবহার্য। কিন্তু বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন আমাদের দেশে অমার্জনীয় অপরাধ। আর তাদের দেশে মধ্যমাঙ্গুল একটু বেঁকে দেখালে অমার্জনীয় অপরাধ বলে গণ্য। রফিক ও ছাদিক শব্দের অর্থ যদি ও বন্ধু। কিন্তু রফিক শব্দটি তুচছার্থে ব্যবহৃত হয়। তাদের আত্ম-গরিমা বা অহংকার যাই বলুন না কেন খোদ আমেরিকাবাসীকে ও মিছকিন বলে অভিহিত করে। এ মনোভাব তাদের প্রকঠ। ওরাই বিশ্বের শ্রেষ্ট ধনী। আবার আমেরিকার কোন দ্রব্যকে ওরা উত্তম বলে গণ্য করে। আমি লক্ষ্য করেছি , মেয়াদোত্তীর্ণ কোন দ্রব্য ভক্ষণ করবে না , কোনক্রমেই খাদ্য দ্রব্যের ক্ষেত্রে। কিছু কিছু সৌদি আরববাসী বাড়িতে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগিয়েছে এবং যথারীতি ফল ও এসেছে। ঐ ফল গাছে পেকে নষ্ট হয়ে যাবে , সে খাবে না বা অন্য কাউকে খেতে ও দেবে না। তাদের ধারণা বদ্ধমুল , স্বাস্ত্য বিভাগ কর্তৃক মেয়াদের সীল দেয়া নেই যে দ্রব্যে তা ভক্ষণ নিষিদ্ধ। ভক্ষণ করলে যে কোন রোগ হতে পারে আশংকায় শংকিত।
রাত্রি ৮ টায় গেলাম নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যার মুল উদ্দেশ্য হচেছ সে দেশের বিবাহের রীতিনীতি প্রত্যক্ষ করা। অনুষ্ঠান স্তলে পৌছে সালাম দিতেই তার জবাবের প্রতিক্ষা করা লাগল না। অনেকে আমাদেরকে ও সালাম দিচেছ , জবাব ও অনেকেই দিচেছ। লক্ষণীয় ব্যাপার যা তা হল করমর্দন করলে বা করমর্দন করতে যেন ওরা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। আমাদেরকে আপ্যায়ন করা হলো যথারীতি মিষ্টিজাত বিভিন্ন দ্রব্য , ফলমুল , চা ইত্যাদি দ্বারা। সিগারেট ও পরিবেশন করা হল এবং কেউ কেউ হুক্কা চলবে কিনা তা জিজ্ঞেস করছিল। লক্ষ্য করলাম হুক্কাটি সেখানে বিলাস দ্রব্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয় এবং আভিজাত্যের প্রতিক স্বরুপ তাকে ধরে নেয়া হয়। একেকটি হুক্কা বেশ বড় এবং তার নল আমাদের দেশের হুক্কার চেয়ে অনেক দীর্ঘ।
কিছুক্ষণ পর বিভিন্ন আলাপ আলোচনা , রসাত্মক হাসি তামাসায় ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটছিল। কিন্তু আমি তাদের কথাবার্তা পুরোপুরি উপলব্ধি করে আনন্দে যোগ দিতে পারছিলাম না। যেহেতু আমি ভাষা সম্বন্ধে ছিলাম অজ্ঞ। কিন্তু এ ক’দিনে যতটুকু আয়ত্বে আনতে পেরেছিলাম তা আর আমার বন্ধুর মাধ্যমে কিছু কিছু কথার অর্থ তাৎক্ষণিক জেনে এবং আকারে ইঙ্গিতে আংশিক বুঝে নিতে কষ্ট হচিছল না। তথাপি ও মনের মধ্যে একটা অর্ন্তজ্বালা ছিল যদি নিজে তাদের সব কথা বুঝতে পারতাম তাহলে মানসিক ভাবে আর ও আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম। যাহোক এক সময় খানা পরিবেশন শুরু হল। আমি ইতস্ততা করছিলাম। কারণ সেখানে ৮/১০ জনকে একেকটি থালা দিয়ে দেয়া হয়। ভাত , তরকারী , রুটি এবং এক জাতীয় তাজা সবজীর পাতা। সবজীর পাতাগুলো ভাতের সাথে কাচা ভক্ষণ করার নিয়ম। আমি রীতিমত আশ্চর্য হচিছলাম ওদের কাচাঁ পাতা ভক্ষণ দেখে। কিন্তু আজ আমি ও এ দ্রব্য খেতে প্রচুর ভালবাসি। এখানে অতুক্তি হবে না প্রথম দিকে আমার মত সকল প্রবাসী বাঙ্গালী অনিচছুক হলে ও পরবর্তীতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যান এবং ভক্ষণে ও আলাদা একটা তৃপ্তি পান।
আরবীদের তরকারি পাক দেখে আশ্চর্য হচিছলাম। কারণ আমাদের পাকের সাথে বিস্তর ফারাক। তরকারী দেখে মনে হচিছল সিদ্ধ করা মাংস সাদৃশ। চুপি চুপি সহকর্মী সিরাজকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তরকারীর ধরণটা তাদের এরুপই। আমাদের সাথে যে ক’জন আরববাসী ছিল প্রত্যেকের একই কথা ছিল খাবার অনুরোধ। কিন্তু আমি হাত নেড়ে ছেড়ে এমন ভাব প্রকাশ করছিলাম , দেখে মনে করবে আমি পেট পুরে আহার করছি। বাস্তবে কিন্তু মোটেই আহার করছি না। ওরা তরকারীতে মোটেই মরিচ দেয় না। তবে অন্যান্য মসলা সামগ্রী পরিমাণ মত দিয়ে থাকে। যে ধরণের খাবার হোক না কেন সাথে থাকবে বিভিন্ন জাতের ফলমুল এবং পানীয়। উচচারণের ক্ষেত্রে একটা ভিন্নতা থাকে আমাদের সাথে। যেমন পেপসিকে ওরা বেবচি বলে থাকে। (সব ক্ষেত্রে নয়) চা থাকবেই থাকবে। ফ্লাক্স ভর্তি চা। আপনার ইচছা মত পান করুন। মেয়েদের পৃথক অনুষ্ঠান যেখানে পুরুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ রুপে নিষিদ্ধ। আতশ বাজী পছন্দ করে না। বোবা লোকের মত শুধু চেয়ে দেখতে লাগলাম। কারণ আরবী ভাষা সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ। রাত ১১ টায় ফিরে আসলাম বাসায়। হৃদয়ে একটা অতৃপ্তি নিয়ে এসেছিলাম ভাষা বুঝি না বলে আমাকে নিয়ে অনেক রসিকতা অর্থ্যাৎ নুতনকে নিয়ে সবার একটা কৌতুহল থাকে স্বভাবজাত ভাবেই।
এবারকার চিন্তা হল মহান রাববুল আলামিন কর্তৃক প্রেরিত পৃথিবীর শ্রেষ্টতম মানব হযরত রাসুল (স:) হিযরতের মাধ্যমে মদিনা মনোয়ারায় স্তায়ী বসবাস। শেষ আবাস ভুমি মদিনা শরীফ দেখা। হযরত মোহাম্মদ (স:) এর মাজার জেয়ারত করা। ৮ জনের একটি দল মদিনা যাবার এক সাথে স্তির হলো। ভোর বেলা মক্কা মদিনা যাবার বাস টার্মিনালে হাজির হলাম। যথারীতি লাইনে দাড়িয়ে পাসপোর্ট দেখিয়ে টিকিট কাটলাম। সেখানে লাইনে দাড়াতে হবেই ছোট-বড় , ধনী-গরিব। কেউ লাইনের নিয়ম ভঙ্গ করবে না , করে না। কিন্তু আমাদের দেশে লাইন করার নিয়ম থাকলে ও আগে যাবার বাসনায় ধাক্কাধাক্কি , ঠেলাঠেলী অথবা স্বজন প্রীতি থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারটা সেখানে একেবারে উধাও। কত সুন্দর এ দৃশ্য। সকলের মন মানসিকতায় একটা আলাদা অনুভুতি প্রদীপ্তমান বা ধৈর্য্যরে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্বরুপ। যখন যে মুহুর্তে এসেছে তখন লাইনের শেষ প্রান্তে হলে ও দাড়িয়ে কাজ সমাধান করবে। গাড়িতে উঠে বসলাম। কত সুন্দর গাড়ি। সিটগুলো ঝকঝকে। গাড়িটি পুরাতন হলে ও মনে হবে নূতন। লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ি নেই। সব গাড়িতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। অতিরিক্ত যাত্রী যেমন নেবে না ,অনুরুপ সিট না থাকলে কোন যাত্রী উঠবে না। কন্ট্রাক্টর ও হাঁকবে না। মোরগের খাঁচায় বন্দী স্বরুপ অতিরিক্ত লোভের আশায় অধিক যাত্রী বুঝাই করতে দৃশ্যটা আমাদের দেশের দৃশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত নয় কি ?
প্রভাতের আলো ঠেলে ঠেলে আমাদের বাসটি এগিয়ে যাচেছ মদিনার পানে জেদ্দা নগরীর বাস টার্মিনালকে পেছনে ফেলে। বাসের ড্রাইভার মধ্য বয়সী জ্বলজ্বলে ফর্সা চেহারা আর গাল ভর্তি দাঁড়ি। মধ্যে মধ্যে তিনি ক্যাসেট চালিয়ে আরবী গান গজল শুনাচেছন। মৃদু সুরে বেশ ভালই লাগছিল শুনতে। রাস্তাগুলোতে ঝাকুনী খাবার ভয় বা আশংকা নেই। অথচ কঠিন ছিল একদিন হাজীদের জন্য এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া। দুর্গম মরুপথ ১২/১৩ দিন বা কোন কোন সময় তার চেয়ে ও বেশী সময়ে পায়ে হেঁটে হাজীরা মক্কা থেকে মদিনায় গেছেন। বিশ থেকে চল্লিশ বৎসর কিংবা তার একটু বেশী সময় আগে যখন হাজীরা দলবেঁধে এই পথ পাড়ি দিতেন। তখন তাদের মুয়াল্লেম সশ্রস্ত্র আর একটি দলকে সাথে দিতেন হাজীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। কারন তখন এ রাস্তা শুধু দুর্গম ছিল না , ছিল নিরাপত্তার ও অভাব। হাজীদের সহায় সম্ভল ছিনিয়ে নিত দস্যু , ডাকাতরা হানা দিয়ে। এর পূর্বেকার ইতিহাস ভাবলে বা ঘাটলে রীতিমত শিউরে উঠতে হয়। কত শ্বাপদ সংকুল ভয়ানক বিপদের আশংকা নিয়ে প্রিয় নবী দু’জাহানের সরদার মুহাম্মদ (স:) কত কষ্ট স্বীকার করে এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। গুহায় কত রাত কাটিয়েছেন, রীতিমত ঘর্মাক্ত হতে হয়। কত স্মৃতি বিজড়িত ভয়ানক সে সব কাহিনী।
আজ আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানে ঘুমিয়ে আরাম আয়েশকে সম্ভল করে চলছি তা ভাবতে আশ্চর্যবোধ হবার নয় কি ? সকলে সকালের নাস্তা সেরে গাড়িতে উঠেছি। সুতরাং কারো ও বিশেষ কোন তাড়া নেই। আপন মনে ড্রাইভার গাড়ি চালাচেছন। পথে যেতে যেতে চোখে ভেসে উঠে , উঠবে কয়েক মাইল পর পর রাস্তার দু’ধারে ফিলিং ষ্টেশন , রেষ্টুরেন্ট , সুপার মার্কেট ও মসজিদ একই কম্পাউন্ডে অবস্তানরত। এ ধরণের দৃশ্য পুরো রাস্তা জুড়ে বিদ্যমান। কিন্তু নেই কোন লোকালয়। আছে লালচে রং আর কালো তামাটে রং এবং ধু ধু বালি ও বিরান ভুমি , পাথুরে মাটি। নেই গাছপালা বা রবি শষ্যের বিন্দু বিসর্গ। তবে ইদানিং সরকার কর্তৃক রোপন করা হচেছ রাস্তার উভয় পার্শ্বে গাছের চারা।
মাটিতে আছে কিন্তু অফুরন্ত উর্বরা শক্তি। আল্লাহর অপার মহিমা এ বালি আর পাথরের নীচে স্তরে স্তরে সাজিয়ে পূর্ণ করে ভান্ডার পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন অফুরন্ত তরল সোনা আর তৈল। (চলবে)

লেখক মিজানুর রহমান মিজান
সভাপতি বিশ্বনাথ সিলেট।
মোবা ০১৭১২৮৭৯৫১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here